ইন্টারপোল ও এআই’য়ে দুবাইয়ে কট বেনজির
পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই থেকে গ্রেফতার হয়েছেন। রবিবার জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ
লাবণ্য চৌধুরী : ইন্টারপোল ও এআই প্রযুক্তি ধরল বেনজিরকে-লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। পরিকল্পনা ছিল দুবাইয়ে ট্রানজিট শেষে গন্তব্যে পৌঁছানোর। তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরায় ধরা পড়ে দুবাই তার যাত্রার শেষ গন্তব্য। বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক এআইভিত্তিক ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিতে শনাক্ত হওয়ার পর ইন্টারপোলের তথ্যভান্ডার মিলিয়ে তাকে গ্রেফতার করে দুবাই পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
দুবাই পুলিশের বরাতে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি তিনি (বেনজীর) লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওয়ানা হন। ট্রানজিট ছিল দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নির্ধারিত ফ্লাইটে বিমানবন্দরে নামার পর অন্যান্য যাত্রীর মতোই ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসেন তিনি।
পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই থেকে গ্রেফতার হয়েছেন। রবিবার জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। রোববার (১৪ জুন) দুপুরে তাকে গ্রেফতারের খবরটি ফাঁস হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয় সারাদেশে। জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে নানান প্রশ্ন বেনজিরকে দেশে ফেরানো যাবে তো। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অত্যন্ত প্রভাবশালী এ পুলিশ কর্মকর্তা ধরাকে শরা জ্ঞান করেছিলেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পলাতক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়েছিল।পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে কে জানান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করেছে দুবাই পুলিশ। গত ১২ জুন এক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশকে অবহিত করে সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদে বক্তৃতাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে তাদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, খুব শিগগির তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
এদিকে রোববার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক (মিডিয়া) আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়েছিল।
সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ১২ জুন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বেনজীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর সফল সমাপ্তি ঘটতে সর্বনিম্ন তিন থেকে ছয় মাস এবং জটিল পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ দুই বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।
২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর দুবাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ এবং ইউএইর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। চুক্তিগুলো হলো- নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি, দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর চুক্তি এবং বন্দি/অপরাধী প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত চুক্তি।
ইউএই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির তালিকায় বাংলাদেশের সঙ্গে ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ এবং ‘দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্থানান্তর চুক্তি’ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আইনি সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে বিদ্যমান। এ চুক্তির আওতায় যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ বা ইউএইতে গুরুতর অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যান, তবে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে ফেরত চাওয়া যেতে পারে। তবে চুক্তি থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে হস্তান্তর করা হয় না; প্রত্যেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, আইন ও চুক্তির শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচিত হয়।
জানা গেছে, পলাতক আসামি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সাধারণত পাঁচটি মূল ধাপ পার হতে হয়। বাংলাদেশ সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারকে বেনজীরকে হস্তান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠাবে। আমিরাতের বিচার বিভাগ বাংলাদেশের পাঠানো অনুরোধ ও অভিযোগের নথিগুলো আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করবে।
‘দ্বৈত অপরাধ’ যাচাই: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে অপরাধের জন্য প্রত্যর্পণ চাওয়া হচ্ছে, তা উভয় দেশেই অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে। যেহেতু দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও গুরুতর অপরাধ, তাই এ শর্তটি সহজেই পূরণ হবে। বেনজীর আহমেদ নিজে ইউএই আদালতে প্রত্যর্পণ আদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি বা আপিল করতে পারবেন, যা পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে পারে।
আদালতের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ইউএই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে আসামিকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে।
বেনজির কবে আসবে কব্জায়-
পুলিশ সদর দফতর বলছে, সুনির্দিষ্টভাবে এটা বলা কঠিন। বাস্তবতার নিরিখে তিনটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দ্রুততম পরিস্থিতি (তিন থেকে ছয় মাস): আসামি যদি কোনো আপত্তি না জানান এবং ইউএই সরকার সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি (৬ থেকে ১২ মাস): ইউএই আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক চিঠিপত্র আদান-প্রদানের সময় মিলিয়ে।
জটিল পরিস্থিতি (এক থেকে দুই বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। বেনজীর আহমেদ যদি ইউএইতে শক্তিশালী আইনি লড়াই শুরু করেন কিংবা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। বেনজীর আহমেদ ইউএইতে ভালো আইনজীবী নিয়োগ করে প্রত্যর্পণ ঠেকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া সেখানে তার কোনো সম্পদ, দীর্ঘমেয়াদি ভিসা (যেমন গোল্ডেন ভিসা) বা ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব থাকলে আইনি প্রক্রিয়া আরও জটিল রূপ নিতে পারে।
তবে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকার কারণে এবারের পরিস্থিতি অন্য পলাতক আসামিদের তুলনায় বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি অনুকূলে। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইন্টারপোলের সহায়তায় মোট ১৬ থেকে ১৭ জন পলাতক আসামিকে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।
এর মধ্যে নূর হোসেন (নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আসামি): ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সাত খুনের পর নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১৪ জুন কলকাতায় তিনি গ্রেফতার হন এবং একই বছরের ১২ নভেম্বর ভারত তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অর্থাৎ, ভারতে গ্রেফতারের পর তাকে দেশে ফেরাতে সময় লেগেছিল প্রায় পাঁচ মাস।
পি কে হালদার (আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা): ২০১৯ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া পি কে হালদারকে ২০২২ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগর থেকে দেশটির এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) গ্রেফতার করে। তবে ভারতেও তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা থাকায় এবং সেই দেশের আইনি প্রক্রিয়া ও শাস্তির মেয়াদ শেষ না হওয়ায়, গ্রেফতারের চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।
আরাভ খান: আরাভ খান নামের আরেক নাম রবিউল ইসলাম। পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মামুন এমরান খান হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়। তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করলেও দেশে ফেরানো জটিল হয়ে যায়। কারণ, তার কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট থাকার তথ্য আসে। তিনি বাংলাদেশি নাগরিক হলেও অন্য দেশের পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট ব্যবহার করায় শেষ পর্যন্ত তাকে ফেরানো যায়নি।
এছাড়া ইন্টারপোলের সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে ফেরত আনা অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র থেকে মো. আবুল কালাম, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আরিফুল ইসলাম (শিমুল), ইরান থেকে নান্নু মিয়া, মালয়েশিয়া থেকে আবদুর রহমান ও পেয়ার আহমেদ, সিঙ্গাপুর থেকে মোহাম্মদ ফারুক হোসেন, সৌদি আরব থেকে আবু তাহের ও কামরুল ইসলাম, নিউজিল্যান্ড থেকে আবদুর রহমান মিয়া, ভারত থেকে চন্দু মোহাম্মদ সদরুদ্দিন এবং ইউএই থেকে সাঈদ ও তারেক আহমেদ। জানা গেছে, ২০২৪ সালের গত ৪ মে স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বেনজীর আহমেদ ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন।




