• বুধবার , ২৬ আগস্ট ২০২৬

সুপার পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারির ধান্ধাবাজি-তদন্তে বিপিসি


প্রকাশিত: ৮:৫৭ পিএম, ২৬ আগস্ট ২৬ , বুধবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৬ বার

 

উপস্থাপিত নোট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আগের আবেদন নাকচ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করা হয়নি। অথচ নোটে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের আবেদন, পরবর্তী সময়ে বিপিসির তদন্ত কমিটি গঠন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে সেই কমিটির প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে।

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি: সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি পরিচালনার অনুমতি চেয়ে করা আগের আবেদন নাকচ হওয়ার তথ্য গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে আবেদন করেছে—এমন অভিযোগের মধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে কমিটি গঠনের জন্য বিপিসির পর্ষদে উপস্থাপিত নোটেও আগের আবেদন নাকচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। বরং ওই নোট প্রস্তুতকারী কর্মকর্তাকেই করা হয়েছে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিপিসির সচিব ও সরকারের উপসচিব শাহিনা সুলতানার সই করা এক অফিস আদেশে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটির প্রসেসিং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘অপারেশন বিভাগ থেকে নোট অনুমোদন হয়েছে। তারাই কমিটির সদস্য নির্ধারণ করে নোট উপস্থাপন করেছে। নোট অনুমোদন হওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। কয়েকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।’পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। অনুমোদন হওয়ার পর আমি নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠনের অফিস আদেশ করেছি।’

বিপিসির আদেশ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এ টি এম সেলিমকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য সচিব করা হয়েছে বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন শাখার উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেনকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদ, মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) ফেরদৌসী মাসুম হিমেল, মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) জাহিদ হোসাইন এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মাসুদুল আলম।

অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। এরপর প্ল্যান্টের প্রসেসিং ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসহ প্রতিবেদন বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেবে।

কমিটি গঠনের আদেশের সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ শিরোনামের প্রতিবেদনের পাশাপাশি কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়েছে।তবে বিপিসির পর্ষদে কমিটি গঠনের জন্য উপস্থাপিত নোট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আগের আবেদন নাকচ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করা হয়নি। অথচ নোটে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের আবেদন, পরবর্তী সময়ে বিপিসির তদন্ত কমিটি গঠন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে সেই কমিটির প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে।

নোটে বলা হয়, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’-এর আলোকে বিদ্যমান রিফাইনারি হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে।

ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় বিপিসি একটি কমিটি গঠন করে। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের ওই কমিটি গঠন করা হয়। পরে ইস্টার্ন রিফাইনারির একজন কর্মকর্তাকে কমিটিতে কো-অপ্ট করা হয়।

২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কমিটির সদস্যরা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের জুলধা ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সিআরইউ প্ল্যান্ট ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন ও আবেদন পর্যালোচনার পর সাত সদস্যের কমিটি ৮ এপ্রিল বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ২০ এপ্রিল ওই প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-১ শাখা থেকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের আবেদন নাকচের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।আবেদনটি নাকচ হওয়ার আড়াই মাস পর, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর নতুন করে আবেদন করেন সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার।

নতুন আবেদনে বলা হয়, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ইউরো-৫ মানের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের জন্য বছরে ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি স্থাপন করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩৮১ মেট্রিক টন। রিফাইনারিতে ক্রুড ডিস্টিলিয়েশন ইউনিটের পাশাপাশি ডিজেল হাইড্রোট্রিয়েটার, রিসিডিউ ডিসালফারাইজেশন এবং আইসোমারাইজেশন ইউনিট স্থাপনের কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে এই দ্বিতীয় আবেদনে আগের আবেদন নাকচ হওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি ২০২৪ সালের আবেদনের সূত্রও এতে দেওয়া হয়নি।নতুন আবেদনের পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসির কাছে মতামত চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। সভার কার্যবিবরণীতে আগের আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ইউনিট-২ প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগে বাস্তবায়িত এসপিএম প্রকল্পের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তিন গুণ বাড়বে।এ কারণে নতুন করে সুপার পেট্রোকেমিক্যালকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে বোর্ড মত দেয়।

কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২০২৪ সালের আবেদন নাকচ করেছিল। ওই সিদ্ধান্তের পেছনে কনডেনসেট নীতিমালা, ২০১৪-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের কথাও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের জন্য সংগৃহীত বা আমদানি করা কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন বা এলপিজি সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করা যাবে না।

অন্যদিকে, বিপিসির ২৩ আগস্টের নোট শিট এবং সুপার পেট্রোকেমিক্যালের দ্বিতীয় আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগের আবেদন নাকচের তথ্য উভয় ক্ষেত্রেই অনুল্লেখিত রয়েছে। বিশেষ করে কমিটি গঠনের জন্য প্রস্তুত করা নোটে ২০২৪ সালের আবেদন ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার কথা থাকলেও আবেদন নাকচের বিষয়টি তুলে ধরা হয়নি।

নোটটি প্রস্তুত করেন বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন। পরে একই বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. ইসতিয়াক হোসেন ও বিভাগীয় প্রধান মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন নোটে স্বাক্ষর করেন। এরপর পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের স্বাক্ষরের পর বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মনজুর আলম প্রধান নোটটি অনুমোদন করেন।

পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব তানজিন হোসেন বলেন, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি করার প্রথম আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি অন্য একটি গোপনীয় চিঠিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাত করা হয়েছে। তাই কমিটি গঠনের নোট শিটে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন কমিটি গঠন হয়েছে। কমিটি নিশ্চয়ই পুরো বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেবে।’এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মনজুর আলম প্রধানের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এখন গঠিত ছয় সদস্যের কমিটি সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, প্রসেসিং সক্ষমতা এবং রিফাইনারি স্থাপনের কার্যক্রম যাচাই করবে। সাত দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।