• শুক্রবার , ২১ আগস্ট ২০২৬

যেভাবে ‘মহামান্য’ রাষ্ট্রপতি ফখরুল


প্রকাশিত: ১১:২৩ পিএম, ২০ আগস্ট ২৬ , বৃহস্পতিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৩৭ বার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাম ধারার রাজনীতিতে নাম লেখান অর্থনীতির এই ছাত্র। তিনি ১৯৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন।মির্জা ফখরুল সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন

বিশেষ প্রতিনিধি : দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

এ নির্বাচনে মোট ৩৪৩টি ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, আর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দেখা গেছে, ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা ২০ মিনিট। ভোট গণনা শেষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা শুরু করেন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী বলে ঘোষণা করেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন, তখনই তুমুল শব্দে টেবিল চাপড়ে সংসদ সদস্যরা অভিনন্দন জানান তাকে।

মির্জা ফখরুলের পাশেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তখনই প্রধানমন্ত্রী নিজের কাছে থাকা একটি লালগোলাপ তুলে দেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের হাতে।এরপরই বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান তার আসন থেকে উঠে আসেন, মির্জা ফখরুলও উঠে গিয়ে কোলাকুলি করেন জামায়াত আমিরের সঙ্গে।একে একে সংসদ সদস্যরা ছুটে গিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানান।

এদিকে অধিকাংশ সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেও ছয়জন দেননি।তাদের মধ্যে ৬ জন জাতীয় সংসদে উপস্থিত হননি। তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের ড. ওসমান ফারুক ও চট্টগ্রাম-৩ আসনের মোস্তফা কামাল পাশা।

এ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি মির্জা ফখরুল।শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন।

যেভাবে ভোট হলো-

আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।সাড়ে তিন দশকের মাথায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহস্পতিবার ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। সংসদ কক্ষে ভোট চলে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একানব্বইয়ের পর এবারই প্রথম একাধিক প্রার্থী ছিলেন। ফলে ভোট আয়োজন করতে হয় আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে।

এতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপি।
প্রার্থিতা বৈধ হওয়ার পরেই এটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, তেইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মহাসচিবই বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। কারণ দলীয় প্রার্থীর বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

এদিন দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে দুপুর ২টায় ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নির্দেশিকা তুলে ধরেন। এর পরপরই ভোটদান শুরু হয়।
প্রথমে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।

তাদের পর বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে ভোট দেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। তার পরে ভোট দেন মির্জা ফখরুল।বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ভোট দেন ২টা ১৯ মিনিটে। ব্যালট পেপার জমা দিতে রাখা হয় তিনটা বাক্স।ভোটগ্রহণ শেষে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই একের পর এক অভিনন্দন বার্তা পেতে থাকেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।সবার আগে শুভেচ্ছা আসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফল ঘোষণার পর সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতির হাতে একটি লাল গোলাপ তুলে দেন সরকারপ্রধান।

চীনা দূতাবাসের অভিনন্দন-

নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়।সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে চীন অনেক গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে যৌথ প্রচেষ্টায় ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ার ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত চীন, যাতে দুই দেশ ও জনগণের বড় রকমের উপকার হয়।

গণফোরামের অভিনন্দন-

মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন গণফোরামের এমিরেটাস সভাপতি কামাল হোসেন।
সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সরকারের দমনপীড়ন, নির্যাতন, মামলা ও কারাবাসের মধ্যেও রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।”

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন-

মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদও। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের এক বার্তায় এ অভিনন্দন জানানোর তথ্য দেওয়া হয়।

পরাজিত অলি আহমেদের অভিনন্দন-

অভিনন্দন এসেছে পরাজিত প্রার্থী অলি আহমদের কাছ থেকেও। নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে একগুচ্ছ প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের এই প্রার্থী।

এ নির্বাচনের শুরুর ও সমাপনীর আনুষ্ঠানিকতা সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন।সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। আর সংরক্ষিত আসনে এমপি আছেন ৫০ জন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে ৩৪৯ জন এমপি রয়েছেন, যারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। তবে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি।

যেভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন ফখরুল-

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সরকারে কৃষি এবং বিমান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন।

বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে সংসদে যাননি তিনি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটিই তার।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন, বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊধর্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে গেছেন। দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তাদের সংসার।

যেভাবে রাজনীতিতে এলেন ফখরুল-

ছাত্রজীবনে বামপন্থায় আস্থা রাখা এই নেতা টানা দেড় দশক ধরে বিএনপির মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।শিক্ষকতা থেকে চার দশক আগে রাজনীতিতে আসা এই নেতার রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা। ‘সজ্জন রাজনীতিক’ হিসেবেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাম ধারার রাজনীতিতে নাম লেখান অর্থনীতির এই ছাত্র। তিনি ১৯৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন।মির্জা ফখরুল সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে সে সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষাকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন ১৯৭২ সালে। এরপর বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক পদে এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর পিএস পদে যোগ দেন।