• বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন ২০২৪

খুনীর আর্তনাদ-


প্রকাশিত: ৭:৩৯ পিএম, ৬ জুন ২৪ , বৃহস্পতিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১৩ বার

বিশেষ প্রতিনিধি : গত ১৮ মে রাজধানীর বসুন্ধরার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে আরিফুল ইসলামকে হত্যার পরদিন কানাডায় পালিয়ে যান সেই নারী খুনী পারভীন। বাংলাদেশে পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে ১৬ মে ঢাকায় এসে লম্পট আরিফুলকে খুন করে পরদিনই তিনি ঠান্ডা মাথায় কানাডা পালিয়ে যান।

ইতিমধ্যে গনমাধ্যমে সাড়া জাগানো এই খুনের দায় স্বীকার করে পারভীন আক্তার দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, সত্য হচ্ছে ওই লম্পটকে খুন না করে উপায় ছিল না আমার। কারণ, ও আমাকে তিঁলে তিঁলে মারতে চেয়েছিল।কিন্তু আমি বেঁচে ছিলাম ওকে মারার জন্যে।আসলে আমি খুন করতে নয়, বরং আত্মহত্যা করার উদ্দেশ্যেই দেশে ফিরেছিলাম। নিজেকে শেষ করার জন্য ছুরি কিনে ছিলাম কানাডা থেকে। সেই ছুরি দিয়েই ওকে মেরেছি।

কেন খুন করলেন-এ প্রসঙ্গে পারভীন বলেন, আমার সংসার তছনছ করে দিয়েছিল আরিফুল। দিনের পর দিন শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছে। গোপন ভিডিও করে তা আমার স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানোর হুমকি দিয়ে মাসে মাসে টাকা নিত। আমাকে এটিএম বুথের মতো ব্যবহার করেছে। দফায় দফায় ১০-১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করে যখন কানাডা থেকে প্লেনে উঠছিলাম, তখনও জানতাম না আরিফুল জাপান থেকে ফিরে আসবে। দেশে ফেরার পরপরই আমাকে ফোন করে সে। তখন সে জানতে পারে, আমি দেশে এসেছি।জানা গেছে, আরিফুল ও পারভীন দু’জনেরই গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে। জাপানি এক তরুণীকে বিয়ে করে বছরখানেক ধরে সেখানেই বাস করছিল আরিফুল। আর স্বামীর সঙ্গে সুখের সংসার করতে কানাডায় যান পারভীন।

পারভীন বলেন, পাঁচ বছর ধরে আমাকে অত্যাচার করছে আরিফুল। ১৭ মে বসুন্ধরার ভাড়া ফ্ল্যাটে ওঠার পরই সে জোর করে আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করে। এরপর যখন আরিফুল ঘুমিয়ে পড়ে তখন মুহূর্তের মধ্যে কী ঘটে গেছে, তা এখন কল্পনাও করতে পারছি না। এখন কানাডায় একটি সেফ হোমে আছি….।

পারভীন জানান, ২০১৬ সালে নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া এলাকার নাজমুল হাসান বাবুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এর এক বছর পর তাঁর স্বামী কানাডায় চলে যান। তখন নরসিংদীর একটি কলেজে লেখাপড়া করতেন পারভীন। ২০১৯ সালের দিকে রায়পুরার আরিফুলের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। ওই সময় হঠাৎ বড় ধরনের রোগ ধরা পড়ে পারভীনের। ক্যান্সারের প্রথম পর্যায় ছিল সেটি।

পাশাপাশি জানতে পারেন, কখনও বাচ্চা নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। এ সময় তাঁকে সাহস জোগান আরিফুল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে আরিফুলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে এ সম্পর্ক ‘ঘনিষ্ঠ’তায় রূপ নেয়। তখন আরিফুল মাসে ১৪ হাজার টাকার বেতনে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেলে ছোট চাকরি করতেন।

কিছুদিন পর পারভীন উপলব্ধি করেন, কী করছেন তিনি! এ সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। পারভীন জানান, পরিচয়ের শুরু থেকে আরিফুল তাঁর স্ত্রী-সন্তানের কথা গোপন করেন। গাজীপুরে তাঁর প্রথম স্ত্রী ও এক মেয়ে থাকত। এক পর্যায়ে আরিফুলের বিয়ের বিষয়টি তিনি জানতে পারেন।

তখন আরিফুল বলতেন, স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বনিবনা নেই। বাচ্চার টানে মাঝেমধ্যে গাজীপুরে যান। বছরের শেষের দিকে পারভীনের স্বামী কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসতেন। ২০২০ সালে আসার পর প্রথমে জানতে পারেন, আরিফুলের সঙ্গে পারভীনের ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক রয়েছে। স্বামীর কাছে সবকিছু স্বীকার করে ক্ষমা চান তিনি। এরপর পারভীনকে দ্রুত কানাডায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন তাঁর স্বামী।

পারভীন বলেন, ‘যখন এ সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছি, তখনই গোপন ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখায় আরিফুল। এও বলেছে, পুলিশকে জানিয়েও লাভ হবে না। কারণ, তার রাজনৈতিক হাত লম্বা। দিনের পর দিন আমাকে অসহনীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার শারীরিক অসুস্থতাকেও কখনো আমলে নিত না সে।এই নরককুণ্ড থেকে বাঁচতেই আরিফুল কে মেরেছি।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ভয়-ভীতি দেখিয়ে হলফনামায় জোর করে সই নিয়ে বিয়ের নাটক করে আরিফুল। এর পর থেকে আমাকে বলতে থাকে, ‘কানাডাপ্রবাসী স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না। একটি আলাদা ফোন আমাকে দেওয়া হয়, যেটা দিয়ে আরিফুলের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করা হতো।’

পারভীন বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমি গভীর ডিপ্রেশনে চলে গেছি। মাসের পর মাস মরার জন্য কীটনাশক ব্যাগে নিয়ে চলতাম। এটাও ভেবেছি, এসব জেনেও কী করে আমার স্বামী সব সহ্য করছে! আমাকে মেনে নিচ্ছে! আমার স্বামী প্রতি মাসে কানাডা থেকে যে টাকা পাঠাত, তার অর্ধেক আরিফুল নিয়ে নিত। তার মোটরসাইকেলের তেল খরচ, দামি মোবাইল সেট কিনে না দিলে ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখাত। বাধ্য হয়ে মাসের পর মাস হাজার হাজার টাকা তাকে দেওয়া লাগত।

নিজে বাঁচতে জাপানি তরুণীর সঙ্গে আরিফুলের বিয়ের সব আয়োজন আমি করেছিলাম। ওই তরুণীর সঙ্গে সব ঠিকঠাক হওয়ার পর কক্সবাজারে হানিমুনে যায় তারা। ওই সময় আমার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছিল আরিফুল। এর কিছুদিন পর সে জাপানে চলে যায়। সেখানে যাওয়ার পর কয়েক মাস কোনো যোগাযোগ করেনি। আমিও ভেবেছি, জাপানি তরুণীর সঙ্গে সুখে আছে।

তবে এ বছরের শুরুর দিক থেকে আবার যোগাযোগ শুরু করে। সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটায় ঈদুল ফিতরের দিন। হঠাৎ কানাডায় আমার স্বামীর কাছে বেশ কিছু ভিডিও পাঠায় আরিফুল। এরপর মেসেজ করে অশ্লীল কথাবার্তা লিখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে ইঙ্গিত করে নানা হুমকি দেওয়া শুরু করে। দ্রুত কানাডা থেকে আমাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো না হলে এসব ভিডিও আত্মীয়স্বজনের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেয়। এতে মানসিকভাবে আমি ভেঙে পড়ি।