রাতারাতি আগের হলফনামাটি সরিয়ে নতুন হলফনামা আপলোড করা হয় বলে অভিযোগ স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের
লাবণ্য চৌধুরী : হলফনামায় জালিয়াতির পরও বিএনপি প্রার্থী বৈধ হলো কিভাবে তা নিয়ে কিশোরগঞ্জ এ তোলপাড় অবস্বথা চলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার মনোনয়নপত্র ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামায় স্বাক্ষর, তারিখ ও ছবি না থাকা, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কলাম ফাঁকা রাখা এবং ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল।এ বিষয়ে গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রথমে সৈয়দ এহসানুল হুদার দাখিল করা হলফনামা আপলোড হলে সেখানে নানা অনিয়ম ও তথ্য গোপনের বিষয়টি সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর রাতারাতি আগের হলফনামাটি সরিয়ে নতুন হলফনামা আপলোড করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের দাবি, যে হলফনামার অনিয়মের কারণে সৈয়দ এহসানুল হুদার মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কথা ছিল, সেটিতেই পরে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এ ধরনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করে তিনি। এ ছাড়া এ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানিয়েছেন এই প্রার্থী।
নথিপত্র মৌলিক বিধি লংঘন-
আপিল সূত্রে ও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সৈয়দ এহসানুল হুদা তার মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামায় একাধিক মৌলিক বিধি লঙ্ঘন করেছেন।নির্বাচন কমিশনের প্রার্থী নির্দেশিকা অনুযায়ী, মনোনয়ন ফরমে কোনো ঘর ফাঁকা রাখা যায় না এবং হলফনামা অবশ্যই যথাযথভাবে পূরণ ও সত্যায়িত করতে হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব মৌলিক শর্তের কোনোটিই যথাযথভাবে মানা হয়নি।
যা নেই হলফনামায়-
আপিলে উল্লেখ করা হয়, হলফনামায় প্রার্থীর কোনো স্বাক্ষর নেই, তারিখ উল্লেখ নেই এবং ছবি সংযুক্ত নেই।এমনকি প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিক দ্বারা যথাযথ সত্যায়ন হয়নি। এমন একটি হলফনামা নির্বাচন আইনে আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন।
ভুল ও গোপন তথ্যের তালিকা
শুধু স্বাক্ষর বা ছবি না থাকাই নয়, অভিযোগ অনুযায়ী হলফনামার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। ৩ নম্বর কলামের ‘খ’ অনুচ্ছেদে ভুল তথ্য, ৩ নম্বর কলামের ‘গ’ অনুচ্ছেদে অসম্পূর্ণ তথ্য, ৭ নম্বর কলামের ‘ক’, অনুচ্ছেদে ভুল তথ্য, ৭ নম্বর কলামের ‘খ’ অনুচ্ছেদে অসম্পূর্ণ তথ্য, ৭ নম্বর কলামের ‘গ’ অনুচ্ছেদ একেবারেই পূরণ করা হয়নি। এ ছাড়া ৮ নম্বর কলাম সম্পূর্ণ ফাঁকা এবং ১০ নম্বর কলামের ‘ক’ অনুচ্ছেদে ভুল তথ্য প্রদান করা হয়েছে।
বিএনপির পক্ষে জেলা রিটার্নিং অফিসার-
আপিলকারীর দাবি, এগুলো কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়, বরং নির্বাচন আইন ও আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন। অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিন এসব স্পষ্ট ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও জেলা রিটার্নিং অফিসার কোনো আপত্তি না তুলে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে বিএনপির পক্ষ নিয়েছেন।আপিলকারীর ভাষ্য, ‘হলফনামা যদি আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হতো, তাহলে এ মনোনয়নপত্র গ্রহণের কোনো সুযোগই ছিল না।’
হলফনামা হেলাফেলার নেপথ্যে পক্ষপাতিত্ব-
হলফনামা হেলাফেলার নেপথ্যে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তারা বলছেন, হলফনামায় স্বাক্ষর, ছবি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাড়াই যদি একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়, তাহলে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়?বিশ্লেষকদের মতে, হলফনামা শুধু একটি কাগজ নয়, এটি ভোটারদের সামনে প্রার্থীর সম্পদ, দায়-দেনা ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের একটি সাংবিধানিক দলিল। সেখানে তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দেওয়া হলে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশ্বাস অবিশ্বাসের মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন-
সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে সৈয়দ এহসানুল হুদার মনোনয়নপত্র বাতিল বা অবৈধ ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলো কিভাবে মূল্যায়ন করে এবং বিতর্কিত মনোনয়নপত্র নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়। কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের ভোটার ও রাজনৈতিক অঙ্গন।




