• শুক্রবার , ৬ মার্চ ২০২৬

হাসিনার সোনা কেলেংকারি


প্রকাশিত: ৮:২৪ পিএম, ২৬ নভেম্বর ২৫ , বুধবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১৭৪ বার

এত সোনা তিনি তার নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করেননি। যদিও হাসিনার সমর্থক গোষ্ঠি বলছেন, এই সোনা হাসিনার না এটা সরকারের সাজানো নাটক।

লাবণ্য চৌধুরী : হাসিনার ৮৩২ ভরি সোনা এখন টক অব দ্যা কান্ট্রি! এনিয়ে তুলকালাম চলছে সারাদেশে।দুদকসহ এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন এত সোনা তিনি তার নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করেননি। যদিও হাসিনার সমর্থক গোষ্ঠি বলছেন, এই সোনা হাসিনার না এটা সরকারের সাজানো নাটক। তবুও কথা উঠেছে, নির্বাচনী হলফনামায় হাসিনা সোনার মূল্যমান উল্লেখ করলেও পরিমান উল্লেখ করেননি।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আক্তার হোসেন আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নয়া তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সব সোনা শেখ হাসিনার না। এতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামও রয়েছে। তবে এসব সোনা বৈধ না অবৈধ, সেটা যাচাই-বাছাই করা শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

অগ্রণী ব্যাংকের দুটি লকার খুলে যে ৮৩২ ভরি (৯ হাজার ৭০৭ দশমিক ১৬ গ্রাম) সোনা পাওয়া গেছে, সেগুলো ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একার নয়। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বোন শেখ রেহানা, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদসহ পরিবারের সদস্যদের নামে ওই সব সোনা জমা রাখা হয়েছিল নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে। এসব সোনার মধ্যে স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি সোনার নৌকা ও হরিণ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ২০০৭ সালে যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছিলেন, তাতে পূবালী ব্যাংকে একটি এবং অগ্রণী ব্যাংকে দুটি লকার থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেটা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান গত ১৪ সেপ্টেম্বর আদালতে লকার খোলার আবেদন করেন। মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অনুসন্ধান তদারক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত একজন সোনা বিশেষজ্ঞ, এনবিআরের কর গোয়েন্দা ও সিআইসি (কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল) মনোনীত দুজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যাংক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লকার তিনটি খোলার আদেশ দেন। সেই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার তিনটি লকার খুলে মালামালের ‘ইনভেন্টরি’ (তালিকা) তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের জিম্মায় রাখা হয়।

দুদকের সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ব্যাংকের ভল্টে থাকা নথি যাচাই করে শেখ হাসিনা, তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ ও বোন শেখ রেহানার নামে থাকা ৮৩২ ভরি সোনা উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখায় একটি লকার খুলে ৫ হাজার ৯২৩ দশমিক ৬০ গ্রাম স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। ওই ব্যাংকেই শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহেনার নামে থাকা আরেকটি লকার খুলে ৪ হাজার ৭৮৩ দশমিক ৫৬ গ্রাম স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। আর পূবালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় থাকা শেখ হাসিনার নামে থাকা একটি লকার খুলে একটি খালি ছোট পাটের ব্যাগ পাওয়া গেছে।

দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, ‘লকারে রাখা চিরকুটের বর্ণনা অনুযায়ী স্বর্ণালংকার শেখ হাসিনা ও তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহেনা সিদ্দিকী, তাঁর ছেলে ববির (রাদওয়ান মুজিব) মর্মে ধারণা করা যাচ্ছে।’

হাসিনার নির্বাচনী হলফনামায় সোনা পরিমান উল্লেখ নেই-

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হতে শেখ হাসিনা হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন গোপালগঞ্জ–৩ আসন থেকে।ইসির ওয়েবসাইটে শেখ হাসিনার হলফনামায় দেখা যায়, তিনি নিজের নামে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন। সোনা ও মূল্যবান ধাতুর অর্জনকালীন মূল্য দেখিয়েছিলেন ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সেখানে সোনার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়ও হলফনামায় সোনা ও মূল্যবান ধাতুর মূল্য বাবদ ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখিয়েছিলেন।আয়, সম্পদসহ আট ধরনের তথ্য হলফনামায় দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয় ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকেই।দেখা যাচ্ছে, ২০০৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনার সম্পদের মধ্যে সোনা ও মূল্যবান ধাতুর মূল্যে কোনো হেরফের নেই।

শেখ হাসিনার আয়কর বিবরণীতেও সোনা ও মূল্যবান ধাতুর শুধু মূল্য দেখানো হয়েছে, পরিমাণ নয়। যদিও আয়কর বিবরণীতে পরিমাণ ও দাম দুটোই দেখানোর জন্য ফরমে বলা হয়েছে।সবমিলিয়ে বলা দুষ্কর যে ৮৩২ ভরির মধ্যে শেখ হাসিনার অংশ কত এবং তার পুরোটা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছিল কি না। কারণ, তিনি হলফনামায় সোনার পরিমাণ উল্লেখ করেননি এবং তা অর্জনের সময়ও জানাননি।

বর্তমান বাজারমূল্যে ৮৩২ ভরি সোনার দাম ১৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার মতো। এই দাম হিসাব করা হয়েছে সোনার মান ২২ ক্যারেট ধরে। বর্তমানে ২২ ক্যারেট মানের সোনার দাম ভরিপ্রতি ২ লাখ ৮ হাজার টাকা।বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) হিসাবে, ১৯৭২ সালে দেশে এক ভরি সোনার দাম ছিল ১৬০ টাকা। তা বেড়ে ১৯৭৭ সালে ১ হাজার ৫০০ টাকা হয়। ১৯৯০ সালে সোনার ভরি ছিল ৬ হাজার ২০০ টাকা। ২০০০ সালে তা কমে হয় ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। যদিও এর পর থেকে দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, শেখ হাসিনার লকার থেকে উদ্ধার করা সোনা তাঁর আয়কর বিবরণীতে না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে কিংবা তাঁর আইনি প্রতিনিধিকে শুনানিতে ডাকার কথা। সেখানেই এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে।অবশ্য শুনানিতে শেখ হাসিনার উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে রয়েছেন। ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এ মামলায় তিনি নিজে আইনজীবী নিয়োগ দেননি। রাষ্ট্র দিয়েছে।
ওদিকে শেখ হাসিনার সমর্থকেরা বলছেন, ব্যাংকের লকারে থাকা সোনা শেখ হাসিনার নয়, দাবি করা হচ্ছে এটা সরকারের সাজানো গল্প।যদিও দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন আজ বুধবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, লকারে পাওয়া সোনা বৈধ না অবৈধ, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।