• শুক্রবার , ৬ মার্চ ২০২৬

সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্র-এনায়েত চক্রে গ্রেফতার সাংবাদিক শওকত মাহমুদ


প্রকাশিত: ৯:১০ পিএম, ৭ ডিসেম্বর ২৫ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৮২ বার

সরকার পতন ঘটানো পর তারা ৪০ সদস্যের জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছিলেন। এনায়েত ওই সরকারে নিজের পছন্দের ১২ জন সদস্যকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুতিও নিতে বলেছিলেন।

শফিক রহমান : বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রে গ্রেফতার করা হয়েছে সাংবাদিক ও রাজনীতিক শওকত মাহমুদ কে। রবিবার তাকে রাজধানীর মালিবাগ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে জানিয়েছেন। শওকত মাহমুদ সাবেক বিএনপি নেতা সিনিয়র সাংবাদিক শওকত মাহমুদ জনতা পার্টি বাংলাদেশ-এর মহাসচিব। শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়েছিলেন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) এজেন্ট দাবি করা এনায়েত করিম চৌধুরী ওরফে মাসুদ করিম। গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রে আরো একাধিক রাঘববোয়ালকে তারা খুঁজছেন।

তার তথ্যের ভিত্তিতেই এবার গ্রেফতার হলেন সাংবাদিক রাজনীতিক শওকত মাহমুদ। ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জনতা পার্টি বাংলাদেশ-এর মহাসচিব শওকত মাহমুদকে রবিবার রাজধানীর মালিবাগ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত এনায়েত জানায়, সরকার পতন ঘটানো পর তারা ৪০ সদস্যের জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছিলেন। এনায়েত ওই সরকারে নিজের পছন্দের ১২ জন সদস্যকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুতিও নিতে বলেছিলেন। যাদের সবাই চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে গঠিত ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশের (জেপিবি) পদধারী নেতা ও অনুসারী।

সরকার উৎখাত তালিকায় ইলিয়াস কাঞ্চনের নাম না থাকলেও রয়েছে দলটির দুই পদধারী নেতা এবং দলটির ছায়াতলে থাকা সাবেক চার আমলা (সাবেক সচিব) ও চারজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার নাম। তাদের মধ্যে একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও আরেকজন আড়াই বছর আগে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা। আমলাদের মধ্যে সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খানকেও সম্প্রতি গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এনায়েতের তথ্যে নাম আসা সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদে সরকারের অনুমতি চাওয়া হবে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের জড়িত থাকার বিষয়ে হাইপ্রোফাইল দেড় ডজন নাম এসেছে। সরকার অনুমতি দিলে সবাইকে পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ওদিকে জেপিবির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে ঝুমুর বারী নামে এক নারীর নাম।

এনায়েত করিম জানিয়েছিলেন, এ ঝুমুর বারীই তাকে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন শওকত মাহমুদের সঙ্গে। পরে শওকত মাহমুদ পরিচয় করিয়ে দেন ইলিয়াস কাঞ্চন এবং দলটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলনের সঙ্গে। ঝুমুর এ মামলায় এনায়েতের সহযোগী হিসেবে গ্রেফতার হওয়া গোলাম মোস্তফা আজাদের স্ত্রী। তার সঙ্গে পূর্ব থেকেই শওকত মাহমুদের সুসম্পর্ক ছিল। মূলত ঝুমুরই নেপথ্যে থেকে জেপিবি গঠন ও বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এনায়েতের কাছ থেকে অর্থ এনে দেওয়ার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করতে থাকেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় একাত্তর টিভিতে জিএম অপারেশন হিসেবে চাকরি করা আজাদ ও নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে চাকরি করা ঝুমুর ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এনায়েতকে জিজ্ঞাসাবাদে ষড়যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠা ঝুমুরকে আটক করার চেষ্টা করছে ডিবি পুলিশ।

অপরদিকে এনায়েত জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, শুধু বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্রেই নয়, অতীতে বিএনপিতে ভাঙন ঘটানোসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে অর্থায়ন করেছেন তিনি। যোগাযোগ করতেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে। নিজের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অনেক হাই প্রোফাইলের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকাও। প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকাই আবার ষড়যন্ত্রমূলক কাজে লাগাতেন। তার পরিবারের কেউ বাংলাদেশে না থাকায় এবং নিজে কোনো পদপদবিতে না থাকায় ভেবেছিলেন, সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবেন। কখনো পরিস্থিতি খারাপের ইঙ্গিত পেলে দেশের বাইরে চলে যাবেন।

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, জেপিবির নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী ২১ জেলা ও ১০০ উপজেলায় কমিটি গঠনের জন্যও টাকা দিয়েছেন এনায়েত। তার স্বপ্ন ছিল- জেপিবি কখনো ক্ষমতার অংশ হতে পারলে তিনি নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন। তবে সেই পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত নেপথ্যে থেকেই কলকাঠি নাড়তে চেয়েছিলেন।

এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ইনস্পেক্টর আক্তার মোর্শেদ বলেন, এনায়েত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। তার কাছে পাওয়া তথ্য যাচাই করে আর কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। ইতিমধ্যে অনেকের নাম আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে, যেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। ডিবি জানিয়েছে, ইলিয়াস কাঞ্চন ও তার নবগঠিত দলের সঙ্গে এনায়েতের যোগাযোগের সত্যতা রয়েছে। দল গঠনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এনায়েত এ দলে প্রতি মাসে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিতেন।.চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ সংক্ষেপে জেপিবি।

আড়াই বছর আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিষ্কার হন সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ। তিনি ও চিন্তাবিদ-কলামিস্ট ফরহাদ মজহার ২০২৩ সালের মার্চে বনানীর এক হোটেলে জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির এক সুধী সমাবেশ ও নৈশভোজের আয়োজন করেন। জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির ব্যানারে ওই অনুষ্ঠানে একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, যাদের শওকত মাহমুদের আগের দুই বিতর্কিত কর্মসূচিতেও দেখা যায়। যদিও বর্তমানে এ সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। তাদের অনুষ্ঠানে অর্থের উৎস নিয়ে তখনও প্রশ্ন উঠেছিল।

ডিবি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে বিএনপি ভাঙার অ্যাসাইনমেন্টে জড়িত ছিলেন এনায়েত। তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা ও ‘র’-এর যোগসাজশে এ কাজ করেন তিনি। এনায়েত করিম বিভিন্ন রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম প্রকাশ করেন, যারা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়ায় ছিলেন। এ কাজে তিনি দেড় কোটি টাকাও খরচ করেছেন। ২০২৩ সালে বনানীর শেরাটন হোটেলের ইনসাফ কায়েম কমিটির অনুষ্ঠানের খরচও বহন করেন তিনি।

ডিবি আরও জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক বছর পর আবার তিনি বাংলাদেশে এসে তৎপরতা শুরু করেন। আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার একটি গুঞ্জন আছে। এ গুঞ্জন উসকে দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে ফেল করিয়ে আরেকটি ওয়ান-ইলেভেন বা জুলাই আন্দোলনের মতো ঘটনা ঘটিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের ষড়যন্ত্র করাই ছিল তার লক্ষ্য। এ ষড়যন্ত্রে জড়িত আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান লেফেটন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) তাবরেজ শামসসহ একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিন্টো রোডের সামনে গাড়ি নিয়ে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরির সময় পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি নিজেকে সিআইএর পরিচালক দাবি করেন। পরে পুলিশ তাকে এবং তার সহযোগী মোস্তফাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। এদিকে একজন ডিআইজির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি চাউর হলেও মূলত এনায়েতের সঙ্গে দুজন ডিআইজির যোগাযোগ ও সখ্যের তথ্য পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।