• শুক্রবার , ৬ মার্চ ২০২৬

মেট্টোরেলের পিলার থেকে আগেও বিয়ারিং প্যাড খুলেছিল-এবার স্পট ডেড-ক্ষতিপূরণ মাত্র ৫ লাখ কেন?


প্রকাশিত: ৬:০৫ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২৫ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ২৫০ বার

 নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ব্ল্যাডমানি এত কম কেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

লাবণ্য চৌধুরী : অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে দুবার মেট্টোরেলের পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়লেও কর্তৃপক্ষের টনক না নড়ায় দূর্ঘটনার শিকার হয়ে করুণভাবে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে এক যুবক। এই মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ব্ল্যাডমানি এত কম কেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ মহল। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগে গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর খামারবাড়ি এলাকায় মেট্রোর একটি পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। ওই সময় কেউ হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে এতে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিল।

এদিকে মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশন এলাকায় নিহত যুবকের পরিচয় পাওয়া গেছে। রোববার মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশনের কাছে পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড পড়ে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন।নিহত যুবকের নাম আবুল কালাম, নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির তেজগাঁও জোনের এসি মো. আক্কাস আলী।নিহতের কাছ থেকে পাওয়া পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি শরিয়তপুরের নড়িয়ার ইশ্বরকাঠি এলাকার বাসিন্দা।

এর আগে, দুপুরে দুর্ঘটনায় আবুল কালামের মৃত্যুর কারণে মেট্রোরেল চলাচল সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) ইফতেখার হোসেন দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে জানান, একটি বিয়ারিং প্যাড পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে মেট্রোরেলের সব চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে-

মেট্রোরেলের ‘বিয়ারিং প্যাড’ কেন বার বার খুলে পড়ছে তা নিয়ে নানা রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কোম্পানির সূত্র বলছে, রাবার ও ইস্পাতের মিশ্রণে তৈরি একধরনের প্যাড, যা অনেকটা বিছানার মতো করে ব্যবহৃত হয়। মেট্রোরেলের উড়ালপথটিকে বলা হয় ভায়াডাক্ট। এর ওপরই রেললাইনসহ যাবতীয় স্থাপনা বসানো হয়। আবার ভায়াডাক্ট বসানো হয় স্তম্ভ বা পিলারের ওপর। এই স্তম্ভকে প্রকৌশলের ভাষায় বলা হয় পিয়ার।

মেট্রোরেলের উড়ালপথটি কংক্রিটের তৈরি, যা ৩০ থেকে ৪০ মিটার লম্বা একেকটি স্প্যান জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু ভায়াডাক্ট ও পিয়ার দুটিই কংক্রিটের তৈরি, তাই দুটি কংক্রিটের বস্তুর একটির ওপর আরেকটি স্থাপন করলে ঘর্ষণজনিত সমস্যা হতে পারে। হতে পারে ক্ষয়, ঘটতে পারে স্থানচ্যুতিও। এ জন্যই ভায়াডাক্ট ও পিলারের মাঝখানে রাবার ও স্টিলের তৈরি বিয়ারিং প্যাড দেওয়া হয়, যা স্থাপনাটির সুরক্ষায় কাজ করে।দুই পিলারের মাঝখানের প্রতিটি স্প্যানের জন্য চারটি করে বিয়ারিং প্যাড রয়েছে; অর্থাৎ একেকটি পিলারের আছে চারটি করে রাবার প্যাড। এগুলোর স্তরে স্তরে রাবার ও বিশেষ স্টিল দিয়ে তৈরি।

খুলে পড়ার কারণ-

পিলার ও ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে বিয়ারিং প্যাডগুলো বসানোর জন্য বেজ বা ভিত্তি রয়েছে। এটি নাট-বল্টু কিংবা অন্য কিছু দিয়ে আটকানো থাকে না; বরং পিলার ও ভায়াডাক্টের মতো ভারী বস্তুর চাপে এটি টিকে থাকে। একেকটি স্প্যানের ওজন কয়েক শ টন হবে। কেন এই দুই ভারী বস্তুর চাপের পরও এভাবে ভিত্তি থেকে ছিটকে বিয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে গেল, তা সবার কাছেই বড় প্রশ্ন। কারণ, এ ধরনের ঘটনা মেট্রোরেলের ইতিহাসে অনেকটা বিরল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এর পেছনে নকশাগত ত্রুটি থাকতে পারে বলে মনে করেন ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা। মেট্রোরেলের লাইনসহ যাবতীয় নকশা প্রণয়নের দায়িত্বে ছিল জাপানের কয়েকটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জোট এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিয়ারিং প্যাডটি বসানো হয়েছে মেট্রোর নিরাপদ চলাচল ও স্থাপনার স্থায়িত্ব ধরে রাখতে। কিন্তু এই ব্যবস্থা নিচে পড়ে মানুষ মারা গেলে তো বলতে হবে এর নকশাগত ত্রুটি থাকতে পারে। মেট্রোরেলের জন্য সবচেয়ে দামি জাপানি পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাহলে তাঁদের নকশায় কী কোনো ত্রুটি ছিল।

এই অধ্যাপক বলেন, মেট্রোরেলের চলাচলের কারণে কম্পনজনিত ভার তৈরি হয়। এটা তো যেকোনো প্রকৌশলীর জানার কথা। এর জন্য যেখানে নাট-বল্টু থাকে, সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু মেট্রোরেলের পিলারের ওপর তো বিয়ারিং প্যাড দেওয়া হয়েছে। তা যাতে নিচে না পড়ে যায়, সেই ব্যবস্থা থাকা দরকার ছিল।

ডিএমটিসিএলের কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, মেট্রোরেলের যে স্থানটিতে দুবার বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছে, সেই জায়গাটিতে বড় বাঁক রয়েছে। এ ছাড়া স্থানটি অন্য স্থানের চেয়ে কিছুটা উঁচুও। কারণ, বিজয় সরণি স্টেশনটি দোতলা, কিন্তু ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার স্টেশন তিনতলা; অর্থাৎ বিজয় সরণি থেকে আস্তে আস্তে রেলপথটি ফার্মগেটে আসতে আসতে উঁচুতে উঠে গেছে।

এটাকে অবশ্য দুর্ঘটনার কারণ বলতে নারাজ অধ্যাপক সামছুল হক। তিনি বলেন, বাঁক ও উঁচু হওয়া প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জের বিষয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নকশা করা হয় এবং বাড়তি খরচ করতে হয়। মেট্রোরেলেও তা হয়েছে। এরপরও কেন নিরাপত্তাঝুঁকি থাকবে? এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, জাপানের সব স্থাপনা ‘সিক্স সিগমা কমপ্লায়েন্স’ মেনে চলা হয়; অর্থাৎ প্রকৌশগত স্থাপনায় ১০ লাখের মধ্যে একটা ভুল হতে পারে। সেই জাপানি প্রযুক্তি, পরামর্শক এবং ঠিকাদারের মাধ্যমে করা মেট্রোরেলে একাধিকবার কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটে? এর জন্য একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট করা দরকার।

নিহতের পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা-তদন্ত কমিটি গঠন

মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশন এলাকায় পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড পড়ে নিহত আবুল কালামের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। আজ রোববার ২৬ অক্টোবর দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করে এসব কথা জানান উপদেষ্টা।উপদেষ্টা বলেন, আহতের উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতের পরিবারের কেউ কর্মক্ষম থাকলে মেট্রোরেলে তাঁকে চাকরি দেওয়া হবে।

উপদেষ্টা জানান, এরই মধ্যে এই ঘটনায় একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে যাওয়া নাশকতা কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান উপদেষ্টা। তিনি জানান, পুনরায় ট্রেন চালু হতে একটু সময় লাগবে। ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, মেট্রোরেলের লাইনের নিচে উড়াল পথের পিলারের সঙ্গে রাবারের এসব বিয়ারিং প্যাড থাকে। এগুলোর প্রতিটির ওজন আনুমানিক ১৪০ বা ১৫০ কেজি। এসব বিয়ারিং প্যাড ছাড়া ট্রেন চালালে উড়াল পথ দেবে যাওয়া কিংবা স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।