নোবেল শান্তি পদকে ‘রাজনীতি’ জিতল মারিয়া
নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন না ট্রাম্প! বিশ্ব শান্তির জন্যে প্রকৃত অর্থে তিনি বেশ লড়াই করে গেছেন। যদিও এর নেপথ্যে ‘বিশেষ-রাজনীতি’ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।কিন্তু তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প বিশ্ব শান্তির জন্যে অনেকটা লড়াই করেছেন যা সন্দেহাতীত! কিন্তু শান্তি যেন আসে আসে না! অবস্থা টা এমন যেন ‘মন খুলে’ সব হচ্ছে না।
শফিক রহমান : কপাল মন্দ বলতেই হবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন না ট্রাম্প! বিশ্ব শান্তির জন্যে প্রকৃত অর্থে তিনি বেশ লড়াই করে গেছেন। যদিও এর নেপথ্যে ‘বিশেষ-রাজনীতি’ রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।কিন্তু তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প বিশ্ব শান্তির জন্যে অনেকটা লড়াই করেছেন যা সন্দেহাতীত! কিন্তু শান্তি যেন আসে আসে না! অবস্থা টা এমন যেন ‘মন খুলে’ সব হচ্ছে না। ফলে ট্রাম্পের আশার গুঁড়েবালি ঘটেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার এবার পেয়েছে ‘রাজনীতি’। এই রাজনীতি হচ্ছে একটা দেশকে এগিয়ে নেয়া। দেখা যায় অনেক দেশ রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবসা করেন। নিজেদের পারপাস সার্ভ করেন। ফলে আসল শান্তি আসেনা।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যস্থতা সত্ত্বেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে ভেনেজুয়েলার একজন রাজনীতিবিদকে দেয়া হয়েছে নোবেল শান্তি পুরস্কার। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘উপেক্ষা’ বা ‘অবজ্ঞা করা হয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। এছাড়া, এর আগে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, তাকে এই পুরস্কার দেয়া না হলে তা হবে ‘যুক্তরাষ্ট্রের অপমান’।এটা অবশ্য অপমানই বটে!
দেখা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বদলে ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতাকে পুরস্কার দেয়ায় নোবেল কমিটির কঠোর সমালোচনা করেছে হোয়াইট হাউস। বলেছে, নোবেল কমিটি শান্তির ওপর রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে।আজ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) চলতি বছরের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুরস্কার পেয়েছেন ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো। দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তিনি এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
পুরস্কার সম্পর্কে নোবেল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান জোর্গেন ওয়াটনে ফ্রায়ডেন্স বলেন, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের দীর্ঘ ইতিহাসে এই কমিটি অনেক প্রচারণা ও মিডিয়া উত্তেজনা দেখেছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার চিঠি পায়।’ তিনি বলেন, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র কাজ (পুরস্কারপ্রাপ্তদের) এবং আলফ্রেড নোবেলের করা উইলের ওপর ভিত্তি করে নিই।
এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প। বারবার তাকে বলতে শোনা গেছে, এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য তিনিই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর গত কয়েক মাসে তিনি সাতটা যুদ্ধ থামিয়েছেন।কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রু’ দেশ ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা। যা ট্রাম্প প্রশাসনকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে বলে মনে হচ্ছে। এমনকি ট্রাম্প পুরস্কার না পাওয়ায় সেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ্যে এলো।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র স্টিভেন চিউং এক এক্স পোস্টে বলেছেন, ‘নোবেল কমিটি প্রমাণ করেছে যে, তারা শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তি চুক্তি, যুদ্ধের অবসান এবং জীবন বাঁচানোর কাজ চালিয়ে যাবেন। তার মধ্যে একজন মানবতাবাদী হৃদয় রয়েছে এবং তার মতো কেউ কখনও শুধু ইচ্ছাশক্তির জোরে পাহাড় সরাতে পারবে না (সমস্যা সমাধান করতে পারবে না।’
ট্রাম্পের নোবেল না পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছে নোবেল কমিটি। মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল জেতার পর এক সাংবাদিক নোবেল কমিটির কাছে ট্রাম্পের ব্যাপারে জানতে চান, ট্রাম্পকে নোবেল দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ বিশ্বের অন্যান্য যেসব জায়গা থেকে চাপ এসেছিল, সেই চাপ তাদের পুরস্কার ঘোষণায় কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না।
নোবেল শান্তি পুরস্কারে রাজনীতি-
নোবেল কমিটি এই বছরের শান্তি পুরস্কারের জন্য ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোকে নির্বাচিত করেছে।জানা গেছে, গেল কয়েক মাস ধরে গণমাধ্যমগুলোতে শান্তিতে নোবেলের জন্য ট্রাম্পের কথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও তার নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়নি।এই সিদ্ধান্তের আগের মাসগুলোতে ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে জোরালোভাবে তুলে ধরেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেকে একজন ‘সেতু নির্মাতা’ (মধ্যস্থতাকারী) হিসেবেও উপস্থাপন করেন।
এছাড়াও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি একাধিক যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন। দুইবারের এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রথম মেয়াদের পর থেকেই নোবেল পুরস্কারের প্রচারণায় ছিলেন। এর মধ্যে তিনি দাবিও করেছেন যে, ‘অনেক মানুষ’ ভাবে যে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।গাজায় দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই বছর নোবেল পুরস্কার জিততে পারেন বলে জল্পনা শুরু হয়।
জানা যায়, ওভাল অফিসের দুই মেয়াদে ট্রাম্পকে ১০ বারেরও বেশি এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে – যার মধ্যে আছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত, একজন ইউক্রেনীয় রাজনীতিবিদ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন এবং নরওয়ের আইনপ্রণেতারা।কিন্তু শুধুমাত্র মনোনয়নই কাউকে প্রার্থী হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না এবং নোবেল কমিটি বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগে প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে না।
এছাড়া, ট্রাম্পের কোনো মনোনয়ন জানুয়ারির সময়সীমার আগে এসেছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি চুক্তিতে যুগান্তকারী মধ্যস্থতার পর ট্রাম্পের নাম সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, নোবেল পুরস্কার না পেলে এটি একটি ‘বড় অপমান’ হবে এবং ‘সাতটি যুদ্ধের সমাধান’ করেছেন দাবিতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির ওপরও এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন।
নোবেল শান্তি পদক পেলেন মারিয়া-
ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো চলতি বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। গভীর বিভাজনে থাকা দেশটির বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ করে এক কাতারে আনতে অসাধারণ ভূমিকার জন্য তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে।এক বিবৃতিতে নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য মারিয়া করিনা মাচাদোকে ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে।কমিটি আরও জানিয়েছে, লাতিন আমেরিকার বেসামরিক মানুষের সাহসের প্রতীক, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক মানুষের নেতা হিসেবে মারিয়া করিনা মাচাদো অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মারিয়া করিনা। দেশটির বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একসময় ব্যাপক বিভাজন ছিল। তবে মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের দাবিতে বিরোধী শক্তি মারিয়া করিনার নেতৃত্বে এক কাতারে শামিল হয়েছিল।মারিয়া করিনা মাচাদো ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে আত্মগোপনে আছেন। ওই বছরের জুলাইয়ের নির্বাচনের পর থেকেই ভেনেজুয়েলার এই বিরোধী নেতা প্রকাশ্যে আর দেখা দেননি।
কে এই মারিয়া করিনা মাচাদো?
৫৮ বছর বয়সি শিল্প প্রকৌশলী মারিয়া করিনা ২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী জোটের মনোনীত প্রার্থী হন। কিন্তু দেশটির শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আদালতের মাধ্যমে তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়। যে কারণে ২০১৩ সাল থেকে দেশটিতে ক্ষমতায় থাকা নিকোলাম মাদুরোকে নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেননি তিনি।
মারিয়া ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ সালে তিনি বিরোধী প্রেসিডেন্টর প্রাইমারিতে প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু হেনরিক ক্যাপ্রিলেসের কাছে হেরে যান। ২০১৪ সালের ভেনেজুয়েলার বিক্ষোভের সময় তিনি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখেন।
২০২৪ সালের ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ঐক্য প্রার্থী হন মারিয়া করিনা। তবে ২০২৩ সালের জুন মাসে ভেনেজুয়েলার কম্পট্রোলার জেনারেলের এক আদেশ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রায় বহাল থাকে। যে কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।মাচাদো করিনা ২০১৮ সালে বিবিসির ১০০ জন নারীর একজন হিসেবে মনোনীত হন এবং ২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে তালিকাভুক্ত হন।




