গাবতলী হাটে লুটপাটের প্রমাণ-দুদকে তলব ডিএনসিসির প্রশাসক এজাজকে
দুদকে তলবের সত্যতা স্বীকার করে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, আমিই এর আগে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। বাজারে অনেক ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম এর কথাবার্তা উঠলে তদন্ত করতে বলি। গাবতলী হাট লুটপাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব নিয়মের মধ্যে হয়েছে। আমরা ২০ কোটির বেশী রাজস্ব তুলেছি।
লাবণ্য চৌধুরী :: নিজের আখের গুছিয়ে নেয়ার কথিত অভিযোগে এবার দুদকের মুখোমুখি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। অভিযোগের মধ্যে গাবতলী হাটের ইজারায় লুটপাটের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া ‘ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের’ অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আগামী বৃহস্পতিবার কমিশনের কার্যালয়ে হাজির হতে বলেছে সংস্থাটি।
দুদকে তলবের সত্যতা স্বীকার করে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, আমিই এর আগে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। বাজারে অনেক ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম এর কথাবার্তা উঠলে তদন্ত করতে বলি। আমিই দুদকে চিঠি দিয়ে বলি তদন্ত করেন। স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা থাকা দরকার। কোথায় অনিয়ম দুর্নীতি থাকলে ইনভেস্টিগেট করেন কে কারা জড়িত তা বের হয়ে আসবে। তাহলে কি বৃহস্পতিবার যাচ্ছেন-এমন প্রশ্নে নিশ্চয়ই। গাবতলী হাট লুটপাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব নিয়মের মধ্যে হয়েছে। আমরা ২০ কোটির বেশী রাজস্ব তুলেছি। নূর আলীর হোটেল সম্পর্কে বলেন সব নিয়মের মধ্যে হয়েছে ইনভেস্টিগেট হোক সব বেরিয়ে আসবে।
অনুসন্ধানে মিলেছে, গাবতলী হাটে লুটপাট নিয়ে গত বছরের ৩০ এপ্রিল দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান পরিচালনা করে লুটপাটের সত্যতা পায়। অভিযোগ করা হয়েছে, গাবতলীর পশুরহাট নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রক্রিয়াগত ভুল দেখিয়ে ইজারা বাতিল করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। নিজেরা হাটের খাজনা আদায়সহ সব দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। সরেজমিনে দেখা দেখা যায়, নিয়ম না মেনেই খাজনা আদায় করছে বহিরাগতরা।
অভিযোগ করা হয়, এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের অবৈধ সুবিধা দিতে ২২ কোটি ২৫ লাখ টাকায় কাজ পাওয়া ইজারাদার আরাত মটরের টেন্ডার বাতিল করা হয়েছে। অথচ নিজেদের পরিচালনা করার কথা থাকলেও তৃতীয় দরদাতা এক ইজারাদার দিয়ে হাট পরিচালনা করা হয়। বর্তমানে প্রতিদিন সরকার ৩০-৩৫ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে নোটিস পাঠানোর বিষয়টি জানাতে পারলেও বিস্তারিত বলতে পারেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে আসা এজাজকে গত বৃহস্পতিবার তলবের এ চিঠি পাঠানো হয়।এতে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, “মিরপুর গাবতলী পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটন দখলভার নেওয়া, বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, সিটি করপোরেশনের ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নানা বিষয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হল। ইতিমধ্যে এজাজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর তথ্য দেয় দুদক। এ জন্য সংস্থার সহকারী পরিচালক মো. আশিকুর রহমানের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল কাজ করছে। অপর সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক সুবিমল চাকমা।
তখন অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন মোহাম্মদ এজাজ।তিনি তখন দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আমরা দুদককে সব ধরনের সহযোগিতা করব। আমরা মনে করি, প্রত্যেক মানুষেরই স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগের তদন্ত স্বচ্ছভাবে হোক-এটা আমরাও চাই।
ঢাকা উত্তর সিটির নতুন প্রশাসক হিসেবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ দেওয়া হয় নদী গবেষণা, পানি ব্যবস্থাপনা ও নগর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজকে।
প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গাবতলী গবাদি পশুর হাট ইজারার দরপত্র বাতিলের ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। গত এপ্রিলে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ উঠলে দুদকের একটি দল উত্তর সিটির কার্যালয়ে অভিযানও চালায়।ইজারা বাতিলকে ‘ত্রুটি’ হিসেবে চিহ্নিত করে এ সিদ্ধান্তে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় হাতছাড়া হওয়ার ‘ঝুঁকি’ তৈরির কথা বলেছিল দুদক।অভিযানে দুদকের দলটি প্রশাসক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে।সেসময় দুদকের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, গাবতলী গরুর হাটের ইজারা দরপত্রে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বের ‘ক্ষতি’ করার প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুদক জানতে পেরেছে-২০২৫ সালের হাট ইজারায় সর্বোচ্চ দর ছিল প্রায় ২২ কোটি টাকা, যা সরকার নির্ধারিত দরের (১৪.৬১ কোটি) চেয়ে অনেক বেশি। মূল্যায়ন কমিটি সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়ার সুপারিশ করলেও তা বাতিল করে ‘খাস আদায়’-এর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়‒বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।তবে হাট ইজারা সরকারি ক্রয় নীতিমালার আওতায় পড়ে না এবং এ ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই‒এমন বিশেষজ্ঞ মতামত পায় দুদক। দুদক বলেছিল, ‘অস্বচ্ছ’ প্রক্রিয়ায় দরপত্র বাতিলের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযান পরিচালনাকারী দলটি পরবর্তী করণীয় জানতে চেয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।




