• শুক্রবার , ৬ মার্চ ২০২৬

এলজিইডির বিষফোঁড়া লুটেরা বাচ্চু দুদকে ধরা


প্রকাশিত: ১০:১৭ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২৫ , মঙ্গলবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ২৫৯ বার

জনমনে প্রশ্ন এমন বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ক্যাডার বাচ্চু কে ঢাকায় পদায়ন কেন? যিনি দুর্নীতির ১৬ কলায় পূর্ণ? ভুক্তভোগীদের দাবি সরকারি লুটপাটের সব টাকা ফেরত নিয়ে তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় ।

 

লাবণ্য চৌধুরী : অবশেষে এলজিইডির বিষফোঁড়া লুটেরা বাচ্চু দুদকে ধরা পড়েছে। রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ ও ৫ম তলা নির্মাণ কাজ না করেই সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজ মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

দুদকের উপ-পরিচালক (গণসংযোগ) আকতারুল ইসলাম দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন—স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. ছাবের আলী, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শামস জাভেদ এবং মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলীর মালিক আবু ।

বাচ্চুর লুটপাট সোয়া কোটি-

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার মাধ্যমে গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনের ৩য় ও ৪র্থ তলার কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন করেছেন। এভাবে তারা ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৬ টাকা আত্মসাৎ করেন, যা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মামলা দায়ের করে দুদক।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে মহা আর্থিক অনিয়ম, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকল্পের টাকা হরিলুটের আরো তদন্ত করছে দুদক। শিগগির আরো মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে দুদক তদন্ত সূত্র দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে জানিয়েছেন।

কে এই লুটেরা বাচ্চু-

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ঢাকা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাচ্চুর বিরুদ্ধে চাউর আছে, ওই পদ বাগাতে তিনি বিনিয়োগ করেছেন ৫ কোটি টাকা। আর ঢাকা জেলার এক্সেনের পদে বসেই স্বল্প সময়ে পকেটস্থ করেছেন সাড়ে ২২ কোটি টাকা।অভিযোগ আছে, শুধু ভুয়া বিল, বাউচার তৈরিই নয় মন্ত্রীর কণ্ঠস্বরও নকল করার সক্ষমতা আছে প্রকৌশলী বাচ্চুর। পতিত আওয়ামী লীগের অর্থ জোগানদাতা বাচ্চু বর্তমান সরকারের জন্য বিষফোড়া বলে খোদ তার বিভাগেরই কর্মকর্তাদের মন্তব্য।

কর্মচারীদের টাকা আত্মসাৎকারী প্রকৌশলী বাচ্চুর স্ত্রী গৃহিণী আসমা পারভীনের নামে বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, জমি এবং নগদ টাকার অঙ্ক কপালে চোখ উঠার মতো।এসব খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে দুদক। সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে টিম। টেকনিক্যাল বিষয়ে দুদক তাদের সহযোগিতা নিচ্ছে। এর আগে অভিযান পরিচালনা করেছে দুদক। নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন।

৬-৪০% টাকা ঘুষের রেট বাচ্চুর-

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না- তবে কালে-ভদ্রে বদল হয় ঘুষের রেট। এলজিইডির একাধিক ঠিকাদার প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এলজিইডি ভবন ঘুষের আঁতুড়ঘর। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতন ও প্রকৌশলী বাচ্চু যোগদানের পর চিত্র পাল্টেছে। ঘুষের নতুন রেট নির্ধারণ করেছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করে ঠিকাদাররা জানান, সঠিক ও স্বাভাবিকভাবে কাজ করার পর বিল উত্তোলনের জন্য পিসি দিতে হতো ৫%, এখন হয়েছে ৬%। কাজ না করেই অগ্রিম বিল উত্তোলনে গুনতে হয় ৪০%। মূল টাকার ১৫% চার্জ বাদে বাকি টাকার ওপর পিসি বসান প্রকৌশলী বাচ্চু গংরা।

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে, ৬৫ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দিয়েছেন বাচ্চু মিয়া। ঠিকাদারদের অভিযোগ সঠিক হলে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ২২ কোটি টাকা। এছাড়াও ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের মোবাইল মেইনটেনেন্সের কাজ না করেই ৫০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

লুটের মাল পরিবারের কাছে-

বাচ্চু মিয়া ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরা, সেক্টর-১১-এ স্ত্রী আসমা পারভীনের নামে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট, গাজীপুর সদর নিশাদনগরে এবং জয়দেবপুরে বাড়ি, পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় একটি প্লট এবং ২০২২ সালে আসমা পারভীনের নামে (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৫-২৯৫২) একটি মূল্যবান গাড়ি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বেনামি গাড়ি ও বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা রয়েছে।

অগ্রিম বিলে ধরা পড়ে  বাচ্চু-

রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিল্ডিংয়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ ও ঢাকার নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে দুদকের একটি দল ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর (এলজিইডি) কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় অভিযানে এলজিইডি ঢাকা জেলা কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে দুদক।

দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে দুদক জানায়-

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, ঢাকা শহর ও পূর্বাচলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পসহ (দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প) স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন- নামীয় প্রকল্পের আওতাধীন একটি প্রকল্প। এটির অফিসিয়াল নাম-ঢাকার মিরপুরে গাবতলী জিপিএস-এর ৬ তলা ভিত্তিসহ ৬ তলা ভবন নির্মাণ। এর আওতায় নির্মিতব্য ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ টিমে ছিলেন, দুদকের সহকারী পরিচালক-স্বপন কুমার রায়সহ তিনজন।

সরেজমিন পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে দুদক কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির দুইটি ফ্লোরের কাজ সমাপ্ত হলেও চারটি ফ্লোরের নির্মাণ বিল ঠিকাদারকে প্রদান করা হয়েছে। আংশিক রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অনিয়ম/দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের নিমিত্ত অবশিষ্ট রেকর্ডপত্রের জন্য চাহিদাপত্র প্রদান করে দুদক টিম।

ব্রিজ নির্মাণে দুর্নীতি লুটপাট-
মামলা হচ্ছে শিগগির-

এছাড়াও আরেক অভিযানে ঢাকার নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে পৃথক এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম প্রথমে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, এলজিইডি, ঢাকা, আগারগাঁও অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে। পরবর্তীতে নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট ব্রিজ নির্মাণ এলাকা ঘুরে দেখে।

পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্ণিত ব্রিজের ৯টি স্প্যানের মধ্যে ৮টি স্প্যানের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও ব্রিজের মাঝখানে দুই পাশের সংযোগ হিসেবে আর্চ স্প্যানের কাজ বাকী রয়েছে। তবে, অফিসে সংরক্ষিত ব্রিজের অগ্রগতি সংক্রান্ত নথিতে কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ দেখিয়ে সর্বমোট প্রায় ৫০ কোটি ৮৪ লাখ ২৯ হাজার ৭৭ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সার্বিকভাবে টিমের পর্যালোচনায় সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ না হয়েও বিল পরিশোধ করায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায় দুদক।
অভিযোগ রয়েছে প্রকৌশলী বাচ্চু গত জুন মাসে কাজ শেষ না করেই দৃষ্টিনন্দন স্কুল প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা, কেরানীগঞ্জ প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকা এবং বান্দুরা ব্রিজে ৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল প্রদান করেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল মেইনটেনেন্সের কাজ না করেই ৫০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই প্রকৌশলী।

বাচ্চু আওয়ামী ক্যাডার থেকে-

জন্মস্থান গাজীপুরের টঙ্গিতে হলেও বাচ্চুরা থাকেন উত্তরায়। বাচ্চু মা ছিলেন জাতীয় পার্টির নেত্রী।
বিএনপি আমলে পরিচয় দিতেন বিএনপি কর্মী হিসেবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুরো দস্তুর আওয়ামী লীগার। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদে নাম লিখিয়েছেন। শোক, সভা-সমাবেশের ডোনারের ভূমিকা পালন করেছেন। বদৌলতে নিয়েছেন সুবিধা।

নিজ জেলা গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় (এলসিএস) মহিলা শ্রমিকদের বেতনের টাকা আত্মসাৎ ও ভুয়া প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কাজে বাধা সৃষ্টি করেন। ক্ষমতার প্রভাবে ওই কর্মকর্তাকেই বদলি করে দিয়েছিলেন বাচ্চু মিয়া। ময়মনসিংহ জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করার নজির স্থাপন করেছেন তিনি।

এছাড়াও কিশোরগঞ্জ, পাবনায় তার অপকর্মের ছোঁয়ায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। যেখানেই তিনি চাকরি করেছেন সেখানেই বাচ্চু মিয়া ভুয়া বিল, এলসিএস কর্মীদের অর্থ আত্মসাৎ, সহকর্মীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছেন। এসব নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি পার পেয়ে গেছেন।

জনমনে প্রশ্ন এমন বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ক্যাডার বাচ্চু কে ঢাকায় পদায়ন? যিনি দুর্নীতির ১৬ কলায় পূর্ণ? ভুক্তভোগীদের দাবি সরকারি লুটপাটের সব টাকা ফেরত নিয়ে তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় ।