এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী’র পদে জাভেদ করিমের পদায়ন ঝুলছে কেন!
লাবণ্য চৌধুরী : ঢাকা জেলা এলজিইডির বিষফোঁড়া নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়া’রা যখন ওপর মহলে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে পোস্টিং নেয় তখন বদনামটা কোথায় কার ঘাড়ে পড়ে সেটা বুঝলেই যোগ্য লোকের শীর্ষ পদে বসানোটা সহজ হয়ে যায়। এলজিইডি সদর দফতরে প্রধান প্রকৌশলীর পদটি রহস্যজনক কারণে খালি রেখে যোগ্য ব্যক্তি জাভেদ করিম এর পদায়ন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ তিনি যোগ্য তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। এনিয়ে নানা কথাবার্তা চাউর হয়ে ঘুরছে প্রকৌশলীদের মাঝে। এলজিইডিতে বদনাম অনেকেরই আছে কিন্তু করিৎকর্মা দক্ষ ক’জন আছেন!
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা যদি অনৈতিক সুবিধা বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে যোগ্য ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে কোনো জুনিয়রকে পদায়ন করেন, তবে সেটি হবে এলজিইডির জন্যে বড় প্রহসন। সিনিয়র প্রকৌশলীরা বলছেন,এলজিইডি শুধু একটি দপ্তর নয়, এটি বাংলাদেশের উন্নয়নের মেরুদণ্ড। এখানে অন্যায় পদায়ন মানে রাষ্ট্রের উন্নয়নকেই ধাক্কা দেওয়া। সরকার চাইলে সহজেই বুঝতে পারবে, কে যোগ্য আর কে নয়— প্রশ্ন হলো, তারা কি সেটা দেখতে চায়?”
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থাগুলোর একটি হলো স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বিদ্যালয়, বাজার উন্নয়ন থেকে শুরু করে পানি নিষ্কাশন পর্যন্ত—এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা নীরবে-নিভৃতে কাজ করে চলেছেন দীর্ঘদিন।
সেই এলজিইডি আজ নিজস্ব কর্মপরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে অভিযোগ উঠছে ‘প্রভাব’ ও ‘ব্যক্তি-স্বার্থের’ অবৈধ লেনদেনের। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যোগ্যতার স্বীকৃতি না দিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও কিছু নীতিনির্ধারকের সুপারিশই এখন নিয়োগ বা পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী— জাবেদ করিম।
তিনি মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে সদর দপ্তর পর্যন্ত প্রশাসনিক ও প্রকৌশল খাতের সব পর্যায়ে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর পেশাগত দক্ষতা, সততা এবং উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সফলতা ইতিমধ্যেই সহকর্মীদের কাছেও প্রশংসিত। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে— এমন অভিযোগ উঠেছে অভ্যন্তরীণ সূত্রের।
এলজিইডির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখানে এখন যোগ্যতা নয়, কে কাকে খুশি করতে পারে সেটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিনিয়র, যোগ্য প্রকৌশলী হয়েও অনেক সময় পদোন্নতির তালিকায় জায়গা পান না; অন্যদিকে প্রভাবশালীদের সুপারিশে জুনিয়ররা পদোন্নতি পেয়ে যাচ্ছেন। এটা পুরো ব্যবস্থার জন্যই ভয়ংকর।”
একজন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বলেন, “জাবেদ করিমের মতো দক্ষ, পেশাদার মানুষ যদি বারবার উপেক্ষিত হন, তাহলে এলজিইডির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। যারা মাঠে থেকে কাজ জানেন, তারাই প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিতে পারেন। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ক আর সুবিধা নেওয়ার ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।”
প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের অনেকে মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে এলজিইডির কর্মদক্ষতা ও মনোবল ভেঙে পড়বে। কারণ, যেখানে পরিশ্রম ও মেধার মূল্যায়ন হবে না, সেখানে যোগ্য কর্মকর্তারা ক্রমে নিরুৎসাহিত হবেন। প্রশাসনিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, সরকার যদি প্রকৃত যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয় বরং রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে পদায়ন করে, তবে সেটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের জন্য একটি অশুভ বার্তা।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব বলেন,“প্রধান প্রকৌশলী পদটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি নীতিনির্ধারণী অবস্থান। এখানে সঠিক ব্যক্তিকে বসানো মানে পুরো দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল রাখা। কিন্তু যদি এই পদে কোনো অনভিজ্ঞ বা অযোগ্য কর্মকর্তা বসানো হয়, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।”
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে— অপেক্ষাকৃত সিনিয়র ও যথেষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়ার পরও জাবেদ করিমকে প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পেতে অন্তরায় সৃষ্টি করছে কারা? প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের চাইতে ব্যক্তি-স্বার্থকে বড় করে দেখা কতটা যৌক্তিক?প্রকৌশলীদের মতে, এলজিইডি একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং সততা—এই তিনটি গুণের সমন্বয় থাকলে তবেই নেতৃত্ব সফল হয়। এই যোগ্যতার ধারাই যদি ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে এক সময় এলজিইডি কার্যত অচল হয়ে পড়বে।




