ইনোভিশনের ভোট জরিপ ব্যবসা- প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে তারেক এগিয়ে :সিইও ইমরান
শফিক রহমান : নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত না হয়েও জনমত জরিপ করে ভোট ও ভোটারদের প্রভাবিত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ইনোভিশন কনসাল্টিং (Innovision Consulting Private Limited) একটি নিবন্ধিত বেসরকারি লিমিটেড এর বিরুদ্ধে। ‘জনমত জরিপ করার লাইসেন্স’ নেই তারপরও সংস্থাটি মহল বিশেষের পক্ষে আসন্ন ১৩ তম নির্বাচন নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইনোভিশন কনসাল্টিং নামের ওই বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি তাদের জরিপের মাধ্যমে তারেক রহমান কে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে রাখছেন! তারা দাবি করেছেন, অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন তারেক রহমান পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে আছেন।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন জনমত জরিপ, এক্সিট পোল (Exit Poll) প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ বা নির্দেশনা জারি করার ক্ষমতা রাখে, তবে জরিপ করার জন্য কোনো সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করে না করায় বিভিন্ন সংস্থা মহল বিশেষে পক্ষে নিজেদের জরিপ রিপোর্ট চালিয়ে দিয়ে ফায়দা লুটছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জনমনে!
যদিও ইনোভিশন কনসাল্টিং (Innovision Consulting) তাদের জরিপে তারেক রহমানকে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রাখার বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের কথা স্বীকার করেনি। তারা এটিকে একটি ‘ডেটা-চালিত বৈজ্ঞানিক ফলাফল’ হিসেবে দাবি করেছে।
ইনোভিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় না থাকায় বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীই প্রধান শক্তি বলে দাবি করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারা ২৪ এর অভ্যুত্থানের বড় দল এনসিপিকে আলাদা করে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। তাদের জনমতে তারেক রহমানের (৪৭.১%) এবং ডা. শফিকুর রহমানের (২২.৫%) এগিয়ে থাকাটা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই একটি চিত্র বলে দাবি করে।
এটি ইনোভিশনের পেশাদারিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা কে প্রশ্নবিদ্ধ করে! কারণ ইনোভিশন বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএআইডির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সাথে কাজ করছে বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট দলকে খুশি করার চেয়ে নিজেদের গবেষণার মান ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু অবস্থা বিশ্লেষনে দেখা যায় তারা জনমত জরিপের মাধ্যমে তারেক রহমান কে প্রাধান্য দিচ্ছে। আর সে কারণে তারা জরিপে অংশগ্রহণকারী কথিত মানুষদের মতামত কে
বাংলাদেশের মানুষের পালস হিসেবে বিবেচনা করাতে চাইছে।
যদিও ইনোভিশন কনসাল্টিং (Innovision Consulting) কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারেক রহমানকে এগিয়ে রেখেছে এমন কোনো প্রমাণিত তথ্য বা আইনি অভিযোগ এখন পর্যন্ত নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের জরিপ প্রকাশিত হলে তা সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে অনেক সময় নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। অন্য কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন: BIGD এর আগের জরিপগুলোর সাথে ইনোভিশনের ফলাফলের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে, যা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
ইনোভিশন কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেডের (Innovision Consulting Private Limited) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং সিইও সদরুদ্দিন ইমরান (Sadruddin Imran)-এর যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, আমরা আসলে ‘মেথোডোলজি’ নিয়ে কাজ করছি। আসলে এটা হচ্ছে ওপিনিয়ন পোল। আমরা ‘ওপিনিয়ন পোল নিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারী থেকে কাজ কাজ করছি। আসলে আমাদের দেশে নির্বাচন যেহেতু ঠিকমত হয় নাই সেহেতু এই ইন্ড্রাষ্টি টা ঠিকমত দাড়াতে পারেনি। আপনি যদি ইউএস ইউকে বা ইন্ডিয়া বা অন্য কোনো দেশের মেথড দেখেন তবে তাদের চেয়েও আমাদের মেথড অনেক বেশী শক্তিশালী।
আমরা মেথডলজিটাকে প্রপারলি ফলো করেছি। এটা কোনো গডগিফটেড বিষয় না মানুষের মতামত পরিবর্তন হতে পারে। এখনও ক্যাম্পিংয়ের আরো ১২/১৩ দিন আছে। আপনারা ৫১৪৭ জন অংশগ্রহণকারীর টেলিফোন সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে জরিপটি করে কি সাড়ে ১৮ কোটি মানুষের মতামত কে দাড় করাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউকে বা ইউএসতে ২ হাজার কিংবা ৩ হাজার লোকের মতামতের ভিত্তিতে সার্ভে করে রেজাল্ট দেয়। অথচ আমরা আদমশুমারির ভিত্তিতে ওপিনিয়ন নিয়েছি। এরপরও বিভিন্ন মতামতেরও ভিন্নতা আছে। আমরা আসলে সব স্যাম্পল নিয়ে ৬৪টি জেলার নারী পুরুষ বিভিন্ন বয়সসহ অন্য যে সব ফ্যাক্টর কাজ করে তা কন্সিডার করে স্যাম্পল ডিজাইন করেছি।
ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার এর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তিনি মিডিয়াকে জানিয়েছেন, তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (যেমন: স্ট্র্যাটিফাইড র্যান্ডম স্যাম্পলিং) ব্যবহার করে সরাসরি ভোটারদের মতামত নিয়েছেন।
ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের জরিপ ব্যবসা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে এগিয়ে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইনোভিশন কনসাল্টিং নামের একটি বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের জরিপের মাধ্যমে তারেক রহমান কে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে রাখছেন! তারা দাবি করেছেন, অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন তারেক রহমান পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে আছেন। সংস্থাটি জানায়, ‘জনগণের নির্বাচনি ভাবনা’ শীর্ষক জরিপের তৃতীয় রাউন্ডের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপিকে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত দল মনে করেন ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা।
শুক্রবার ঢাকার কাওরান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেন ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার।
বিআরএআইএন ও ভয়েস ফর রিফর্ম নামের দুটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতায় ৫১৪৭ জন অংশগ্রহণকারীর টেলিফোন সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ইনোভিশন কনসাল্টিং এর ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভের’ বা ‘জনগণের নির্বাচনি ভাবনা’ শীর্ষক এই জরিপের তৃতীয় রাউন্ড পরিচালিত হয় ১৬ থেকে ২৭ জানুয়ারির মধ্যে।
তৃতীয় রাউন্ডের জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডেও অংশ নিয়েছিলেন।জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করে বিএনপি ও তাদের জোট সরকার গঠনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা পছন্দ করেছেন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটকে।আর উত্তরদাতাদের ২২ দশমিক ৫ শতাংশ জামায়াতের শফিকুর রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন। এনসিপির নাহিদ ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করেছেন উত্তরদাতাদের ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
জরিপে মন্তব্য করা হয়েছে, “জামায়াতের ভোটারদের মধ্যে অস্থিরতা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা দলের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিপরীতে, বিএনপির ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল। জামায়াত থেকে বিএনপির দিকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন স্থানান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে, নির্বাচনের সময় এই প্রবণতায় আবারও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
“জামায়াতে ইসলামী সরাসরি ২২৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায়, ভোটাররা বিএনপি প্রার্থীদের তুলনায় জামায়াত প্রার্থীদের সম্পর্কে কম সচেতন। এটি সম্ভবত বিএনপির তুলনায় জামায়াতের প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার প্রতিফলন।”৩০ শতাংশ ‘ভাসমান’ ভোটারের ওপর পরবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে তুলে ধরে জরিপে বলা হয়েছে, “মোট নমুনার প্রায় ৩০ শতাংশ কোনো রাউন্ডেই ভোটের পছন্দ প্রকাশ করেনি। এই ৩০ শতাংশ ভোটার কাকে ভোট দেবেন তার উপর চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।”
জরিপে বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব জরিপে তুলনামূলকভাবে কম প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিভিন্ন আসনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় রাউন্ডের জরিপ চালানো হয়, তাতে অংশ নেন ১০ হাজার ৪১৩ জন ভোটার। দেশের ৬৪ জেলার ৫২১টি ওয়ার্ডে এ জরিপ পরিচালনা করে ইনোভিশন কনসাল্টিং।
তখন ইনোভিশন কনসাল্টিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সাওয়ার বলেছিলেন, মোট ১০ হাজার ৪১৩ জন ভোটার সেপ্টেম্বরের ‘জনগণের নির্বাচন ভাবনা’ জরিপে অংশগ্রহণ করলেও তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৬৭৩ জন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তা জরিপের মধ্যে প্রকাশ করেছেন।দ্বিতীয় রাউন্ডের জরিপে সমর্থনে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিএনপি, সেপ্টেম্বরের জরিপে ৪১ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। গত বছরের মার্চে প্রথম রাউন্ডের জরিপে এই হার ছিল একটু বেশি, ৪১ দশমিক ৭০ শতাংশ।
জামায়তে ইসলামীর ক্ষেত্রে এই হার মার্চের ৩১ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছিল সেপ্টেম্বরের জরিপে।আর এনসিপির ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ; জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে ১ শতাংশ থেকে দশমিক ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।ব্যতিক্রম শুধু ইসলামী আন্দোলন। তাদের ভোট দিতে আগ্রহীর সংখ্যা মার্চের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে।
আগামী সরকার গঠনে সবচেয়ে যোগ্য দল কোনটি এমন প্রশ্নে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা রায় দিয়েছেন বিএনপির পক্ষে উত্তর দিয়েছে।গতবছরের দুই রাউন্ডের জরিপে আওয়ামী লীগের বিষয়ে জনগণের ভাবনা যাচাই করা হয়েছিল। মার্চের চেয়ে সেপ্টেম্বরের জরিপে আওয়ামী লীগের পক্ষে সমর্থন বাড়ার বিষয়ে দেখতে পাওয়ার কথা বলেছিল ইনোভিশন কনসাল্টিং।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আট মাস পর গত বছরের মে মাসে দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন স্থগিত করায় এবারের নির্বাচনে ব্যালট পেপারে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক থাকছে না।




