• শুক্রবার , ১৯ জুলাই ২০২৪

শরীফা হিজড়া’য় মাতামাতি!


প্রকাশিত: ১০:৫১ পিএম, ২৪ জানুয়ারী ২৪ , বুধবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৫৮ বার


০০ হুজুগে বাঙ্গালী-শরীফা গল্পে ঝড় তুলছে
০০ শিক্ষামন্ত্রী বলছেন বিশেষজ্ঞরা পড়ছেন গল্পটা
০০ ৫ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি-

 

বিশেষ প্রতিনিধি : কথায় আছে হুজুগে বাঙ্গালী কোনো একটা কিছু নিয়ে হৈ চৈ হলেই সেটা নিয়ে অহেতুক মাতামাতি শুরু করে দেয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থাকায় ‘এমনিই নাচনে বুড়ি তার ওপর ঢোলের বাড়ি..’ অবস্থা হয়েছে বাঙ্গালীদের। এসব কথা বলছেন দেশের বিজ্ঞ মহল। আর সে কারণে বলা হচ্ছে, শরীফা গল্প না পড়েই মাতামাতিতে নেমে পড়েছে কতিপয় বাঙ্গালীরা।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের একটি অধ্যায়ে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক একটি পাঠ দেয়া হয়েছে। যেটি এ নিয়ে বিতর্ক চলছে বিভিন্ন মাধ্যমে। বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক একটি অনুষ্ঠানে এ নিয়ে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলাকে কেন্দ্র করে। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, আসিফ মাহতাব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো চুক্তি নেই। এতে আরও বলা হয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তি এবং সহিষ্ণুতা বজায় রাখতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলছে। এ নিয়ে আজ ২৪ জানুয়ারী সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হলে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, পাঠ্যবইয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক পাঠ অংশের উপস্থাপনায় কোনো বিতর্ক বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়ে থাকলে এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করলে কিছুটা পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

তবে বইয়ে শব্দটি ট্রান্সজেন্ডার নয়, থার্ড জেন্ডার আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেটি আইনত স্বীকৃত, যারা জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) কারণে তৃতীয় লিঙ্গ বা সামগ্রিকভাবে সমাজে হিজড়া নামে পরিচিত। তারা এ দেশের নাগরিক। অবশ্যই তাদের নাগরিক সুবিধা আছে। পাশাপাশি মন্ত্রী এটাও স্মরণ করিয়েছেন, দেশে একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে নানা বিষয়ে ধর্মকে ব্যবহার করে বা ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে নানা সময়ে অরাজকতা করার বা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার প্রবণতা আছে।

আসলে কী আছে পাঠ্যবইয়ে। জানা গেছে, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ‘মানুষে মানুষে সাদৃশ্য ও ভিন্নতা’বিষয়ক অধ্যায়ের একটি অংশে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সচেতনতামূলক আলোচনা করা হয়েছে। সেই অংশে আছে, খুশি আপা (শিক্ষক) ক্লাসে একজন অতিথিকে নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ইনি ছোটবেলায় তোমাদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। আজ এসেছেন নিজের স্কুলটা দেখতে। সুমন (শিক্ষার্থী) জানতে চাইল, আপনার নাম কী? তিনি বললেন, আমার নাম শরীফা আকতার। এরপর শরীফা তাঁর জীবনকাহিনি বলতে শুরু করেন। শরীফা বললেন, যখন আমি তোমাদের স্কুলে পড়তাম, তখন আমার নাম ছিল শরীফ আহমেদ। আনুচিং (শিক্ষার্থী) অবাক হয়ে বলল, আপনি ছেলে থেকে মেয়ে হলেন কী করে? শরীফা বললেন, আমি তখনো যা ছিলাম, এখনো তা-ই আছি। নামটা কেবল বদলেছি। ওরা শরীফার কথা যেন ঠিকঠাক বুঝতে পারল না।

আনাই (শিক্ষার্থী) তাঁকে জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি কোথায়? শরীফা বললেন, আমার বাড়ি বেশ কাছে। কিন্তু আমি এখন দূরে থাকি। আনাই মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি, আমার পরিবার যেমন অন্য জায়গা থেকে এখানে এসেছে, আপনার পরিবারও তেমনি এখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছে। শরীফা বললেন, তা নয়। আমার পরিবার এখানেই আছে। আমি তাদের ছেড়ে দূরে গিয়ে অচেনা মানুষদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছি। এখন সেটাই আমার পরিবার। তাদের অবাক হতে দেখে শরীফা এবার নিজের জীবনের কথা বলতে শুরু করলেন।

ছোটবেলায় সবাই আমাকে ছেলে বলত। কিন্তু আমি নিজে একসময় বুঝলাম, আমার শরীরটা ছেলেদের মতো হলেও আমি মনে মনে একজন মেয়ে। আমি মেয়েদের মতো পোশাক পরতে ভালোবাসতাম। কিন্তু বাড়ির কেউ আমাকে পছন্দের পোশাক কিনে দিতে রাজি হতো না। বোনদের সাজবার জিনিস দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে সাজতাম। ধরা পড়লে বকাঝকা, এমনকি মারও জুটত কপালে। মেয়েদের সঙ্গে খেলতেই আমার বেশি ইচ্ছে করত। কিন্তু মেয়েরা আমাকে খেলায় নিতে চাইত না। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলেও তারা আমার কথাবার্তা, চালচলন নিয়ে হাসাহাসি করত। স্কুলের সবাই, পাড়াপড়শি—এমনকি বাড়ির লোকজনও আমাকে ভীষণ অবহেলা করত। আমি কেন এ রকম, এ কথা ভেবে আমার নিজেরও খুব কষ্ট হতো, নিজেকে ভীষণ একা লাগত।

একদিন এমন একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো, যাকে সমাজের সবাই মেয়ে বলে; কিন্তু সে নিজেকে ছেলে বলেই মনে করে। আমার মনে হলো, এই মানুষটাও আমার মতন। সে আমাকে বলল, আমরা নারী বা পুরুষ নই, আমরা হলাম তৃতীয় লিঙ্গ (থার্ড জেন্ডার)। সেই মানুষটা আমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে নারী-পুরুষের বাইরে আরও নানা রকমের মানুষ আছেন। তাঁদের বলা হয় ‘হিজড়া’ জনগোষ্ঠী। তাঁদের সবাইকে দেখেশুনে রাখেন তাঁদের ‘গুরু মা’। আমার সেখানে গিয়ে নিজেকে আর একলা লাগল না, মনে হলো না যে আমি সবার চেয়ে আলাদা। সেই মানুষগুলোর কাছেই থেকে গেলাম। এখানকার নিয়মকানুন, ভাষা, রীতিনীতি আমাদের বাড়ির চেয়ে অনেক আলাদা। আমরা সবার সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়ে একটা পরিবারের মতনই থাকি। বাড়ির লোকজনের জন্যও খুব মন খারাপ হয়। তাই মাঝে মাঝে বাড়িতেও যাই।

আজ থেকে ২০ বছর আগে বাড়ি ছেড়েছি। সেই থেকে আমি আমার নতুন বাড়ির লোকদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে, নতুন শিশু আর নতুন বর-বউকে দোয়া-আশীর্বাদ করে পয়সা রোজগার করি। কখনো কখনো লোকের কাছে চেয়ে টাকা সংগ্রহ করি। আমাদেরও ইচ্ছে করে সমাজের আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন কাটাতে, পড়াশোনা, চাকরি-ব্যবসা করতে। এখনো বেশির ভাগ মানুষ আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না, যোগ্যতা থাকলেও কাজ দিতে চায় না।

তবে আজকাল অনেক মানুষ আমাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। ইদানীং আমাদের মতো অনেক মানুষ নিজ বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করছে। আমাদের মতো মানুষ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। অনেক দেশেই তারা সমাজের বাকি মানুষের মতনই জীবন কাটায়। তবে আমাদের দেশের অবস্থারও বদল হচ্ছে। ২০১৩ সালে সরকার আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমাদের জন্য কাজ করছে। শিক্ষার ব্যবস্থা করছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছে। নজরুল ইসলাম ঋতু, শাম্মী রানী চৌধুরী, বিপুল বর্মণের মতো বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ সমাজজীবনে এবং পেশাগত জীবনে সাফল্য পেয়েছেন।

এরপর কর্মক্ষেত্রে সফল কয়েকজন হিজড়ার ছবি এবং তাদের কাজের ক্ষেত্র দেওয়া হয়েছে শরীফার গল্পে। তারপর বলা হয়েছে, ওরা (শিক্ষার্থী) এত দিন জানত, মানুষ ছেলে হয় অথবা মেয়ে হয়। এখানেও যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সে কথা ওরা কখনো শোনেনি, ভাবেওনি। কিন্তু শরীফা আলাদা রকম বলে সবাই তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, এমনকি তার পরিবারের লোকেরাও!

শরীফার জীবনকাহিনি শুনে সবার মন এমন বিষাদে ভরে গেল যে তাকে আর বেশি প্রশ্ন করতেও ইচ্ছে করল না।এরপর শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা ও নানা প্রশ্নের মাধ্যমে শেখার অংশ রয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই খণ্ডকালীন শিক্ষকের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাজন নানা রকমের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন,
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা উচিত। সেটি হলো, এই অধ্যায়ে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটিই ব্যবহার করা হয়নি। লৈঙ্গিক পরিবর্তন সম্পর্কে কোনো কথাই বলা হয়নি। এখানে হিজড়া জনগোষ্ঠী বা থার্ড জেন্ডার শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

রাষ্ট্র এই ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী’কে স্বীকৃতি দিয়েছে। হিজড়ারাও মানুষ। সৃষ্টির এই বৈচিত্র্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কারণ, বিরূপ আচরণের কারণে তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যাতে বিরূপ আচরণ না করা হয়, সে বিষয়েই মূলত সচেতন করা হয়েছে।

৫ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি-

সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের আলোচিত ‘শরীফার গল্প’ পর্যালোচনায় পাঁচ সদস্যের কমিটি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুর রশীদকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর কফিল উদ্দীন সরকার, এনসিটিবির সদস্য মোহাম্মদ মশিউজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল হালিম এবং ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রশিদ।বুধবার মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেছেন, “উদ্ভূত আলোচনার প্রেক্ষিতে উক্ত বিষয়ে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এনসিটিবিকে সহায়তা করার জন্যে ৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।”

সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বইয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর পাঠ অংশের উপস্থাপনায় কোনো বিভ্রান্তি বা বিতর্ক থাকলে তা পরিবর্তনের কথা একদিন আগে বলেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।
‘শরীফার গল্প’ নামে সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বইয়ে হিজড়া ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক একটি পাঠ অংশ রয়েছে। সেখানে হিজড়াদের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

গত শুক্রবার রাজধানীতে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে এক আলোচনায় পাঠ্যবইয়ের এ অংশের পাতা ছিঁড়ে ফেলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাব। তার দাবি, ‘শরীফার গল্পে’ সমকামিতাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে।এ শিক্ষকের চাকরি হারানোর আলোচনার মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আসিফ মাহতাবের আর চাকরির চুক্তিতে নেই। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।