• বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন ২০২৪

অটো ব্রিকস:২ লাখ কৃষিজমি রক্ষা করবে: ড. বি এম দুলাল


প্রকাশিত: ৯:৪৭ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১৪০৭ বার

আধুনিক অটো ব্রিকস উৎপাদনকারী এবং বাংলাদেশ অটোব্রিক্স ম্যানুফ্যাকচারস এসোসিয়েশন (বাবমা) এর মহাসচিব ড. বি এম দুলাল (ইনসেটে)

এস রহমান : একান্ত সাক্ষাৎকারে বাবমা মহাসচিব বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে এবং কৃষি জমি বাঁচাতে হলে দেশের সব ব্রিক ফিল্ডকে আধুনিক অটো অটো ব্রিকস পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আধুনিক ইট তৈরীর এ পদ্ধতিতে অটো ব্রিকস তৈরী করলে দেশের প্রায় পৌণে ২ লাখ কৃষি জমি যেমন বাঁচবে তেমনি বায়ু মন্ডলের ওজন স্তর রক্ষা ও পৃথিবীর উষ্ণায়ন হ্রাস পাবে বলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ অটোব্রিক্স ম্যানুফ্যাকচারস এসোসিয়েশন (বাবমা) এর মহাসচিব ড. বি এম দুলাল। জাতিরকন্ঠ কে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাতকারে বাবমা মহাসচিব এসব তথ্য জানান।

সাক্ষাতকারে বাংলাদেশ অটোব্রিক্স ম্যানুফ্যাকচারস এসোসিয়েশন (বাবমা) এর মহাসচিব বলেন, আধুনিক অটো ব্রিকস প্রতিষ্ঠান ১৫ থেকে ২০ বিঘা জমি ব্যবহার করে বার্ষিক উৎপাদন করা যায় তিন কোটি ব্রিকস। কিন্তু সনাতন পদ্ধতির ইট ভাটায় একই পরিমাণ জমি ব্যবহার করে বার্ষিক উৎপাদন করে ২০ বিশ লক্ষ ব্রিকস। এই হিসেবে সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি বছর ৯০০০ ইটভাটায় এক লক্ষ আশি হাজার বিঘা কৃষি জমি ব্যবহার হয়। যদি সব ইট ভাটা অটো ব্রিক্স প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন করা হয় তবে জমির প্রয়োজন মাত্র ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১৮০০০ বিঘা লাগবে। এর ফলে ১,৮০,০০০-১৮,০০০= ১,৬২,০০০বিঘা চাষ উপযোগী কৃষি জমি বাঁচবে।

দেশের কৃষি জমি বাঁচাতে ড. বি এম দুলাল তাঁর এই ফর্মুলা বন ও পরিবেশ মন্ত্রীকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, দেশের পরিবেশ ও কৃষি জমি বাঁচাতে সরকার শিগগির আধুনিক পদ্ধতিতে অটো ব্রিকস উৎপাদন কার্যক্রম দেশের সর্বস্তরে চালু করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।তিনি বলেন, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইট অতি প্রয়োজনীয় উপাদান।

কাজেই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা আনয়নের মাধ্যমে কৃষি জমি রক্ষাকল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল (মাটি) সাশ্রয় ও সৃষ্ট দূষণ লাঘবে উক্ত ব্রিক্স প্রতিষ্ঠান সমূহ অর্থাৎ ‘টানেল কিলন’, ‘হাইব্রিড হফম্যান কিলন’ এর মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তিতে ইট প্রস্তুত করে থাকে। ২০১৯ সালের ২১ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় গেজেটের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারি করে ( প্রজ্ঞাপন তারিখ : ২১ জুলাই ২০১৯ নং ৩৬.০০.০০০০.০৬০.০৬.০৩০.১৭-১৫৮) টানেল কিলন ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন প্রযুক্তির অটো ব্রিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে।

ড. দুলাল বলেন, গবেষণায় মিলেছে, বর্তমানে বায়ু মন্ডলের দূষণের ক্ষেত্রে ৬৮% ক্ষতির কারণ হলো সনাতন পদ্ধতির ইট ভাটা সমূহ। এদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ ২৩ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন এবং আরো হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় সনাতন পদ্ধতিতে ইট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কারণে। তাই এসব সনাতন ইট ভাটা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরী।

তিনি বলেন, বায়ু মন্ডলের ওজন স্তর রক্ষা ও পৃথিবীর উষ্ণায়ন হ্রাসের প্রত্যয়ে আধুনিক অটো ব্রিকস পদ্ধতির প্রতিষ্ঠান সমূহের হাইব্রিড হফম্যান কিলন এর উপর পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত সমীক্ষা প্রতিবেদনে পরিবেশ দূষণের কোন প্রভাব পায়নি। অন্যদিকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অধিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নদীর পলি বাহিত মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরী করা যায়, কিন্তু সনাতন ইট ভাটায় নদীর পলি মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরী সম্ভব নয়।

ইট পোড়ানো আইন ২০১৯ অনুযায়ী ৫০% ফাঁপা ইট তৈরী করা হলে ৫০% মাটি সাশ্রয় হয়, ফলে মাটির ব্যবহার ১৫-২০%(শতাংশে) নেমে আসে। গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী হিমালয় থেকে প্রতি বছর ১১০ কোটি ঘন মিটার পলি বাংলাদেশে নেমে আসে। যার মধ্যে ৪০ কোটি ঘন মিটার পলি দেশের নদীগুলোতে থেকে যায়। ৪০ কোটি ঘন মিটার পলি পায়রা উপকুলে জড়ো হয় এবং ৩০ কোটি ঘন মিটার পলি বঙ্গোপসাগরে পড়ে। যা ব্যবহার করে আমরা টপ সয়েলের এর ব্যবহার বহুলাংশে কমাতে পারি।

অটো ব্রিক্স প্রতিষ্ঠানে কিভাবে পৌণে ২ লাখ বিঘা কৃষি জমি বাঁচাতে পারে? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আধুনিক ব্রিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ১৫ থেকে ২০ বিঘা জমি ব্যবহার করে বার্ষিক উৎপাদন করে ৩,০০০,০০০০(তিন কোটি) পিস ইট। কিন্তু সনাতন পদ্ধতির ইট ভাটায় একই পরিমাণ জমি ব্যবহার করে বার্ষিক উৎপাদন করতে পারে ২০,০০,০০০(বিশ লক্ষ) পিস ইট। এই হিসেবে সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি বছর ৯০০০ ইটভাটা কে ২০ বিঘা দিয়ে গুণ করলে ১,৮০,০০০(এক লক্ষ আশি হাজার) বিঘা কৃষি জমি ব্যবহারের হিসাব দাড়ায়। যদি সব ইট ভাটা অটো ব্রিক্স প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন করা হয় তবে জমির প্রয়োজন মাত্র ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১৮০০০ বিঘা লাগবে। এর ফলে ১,৮০,০০০-১৮,০০০= ১,৬২,০০০ বিঘা চাষ উপযোগী কৃষি জমি বাঁচবে।

অটো ব্রিক্স কারখানায় সরাসরি মাটির সাথে আগুনের কোন সম্পর্ক থাকে কি? এ প্রশ্নে বাবমা মহাসচিব বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত অটো ব্রিক্স কারখানায় সরাসরি মাটির সাথে আগুনের কোন সম্পর্ক থাকে না। কারন অটো ব্রিকসের চুল্লি ভিত্তির উপর নির্মিত হয়। তাই মাটির উর্বরতা হ্রাস পায় না কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে সরাসরি মাটির উপরে ইট পোড়ানো হয়। ফলে মার্টি উর্বরতা হ্রাস পায়। তাছাড়া আমাদের প্রতিটি কারখানায় সারা বছর ধরে উৎপাদন হওয়ায় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন শ্রমিক কর্মরত থেকে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবিকা র্নিবাহ করে আসছে। বর্তমানে সনাতন ব্রিক ফিল্ডে কর্মরত শ্রমিকরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগদান করছে।

ড. দুলাল বলেন, অনেক সেক্টরে সরকার বিনা সুদে বা স্বল্প সুদে বিনিয়োগ করে থাকে এবং নগদ সহায়তাও প্রদান করে থাকে। যেহেতু উক্ত বিষয়টি বায় দূষণের সাথে জড়িত এবং স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরুপ সেহেতু সরকারকে অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। সরকার উক্ত বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে আমাদের উপর অধিক ভ্যাট আরোপ করেছে।

অটো ব্রিকস শিল্পের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত কি? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশে ১২০টি অটো ব্রিক্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এ সকল প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৮০০,০০০০,০০০(চার হাজার আটশত কোটি) টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। আর সনাতন পদ্ধতিতে জায়গা ভাড়া নিয়ে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে উৎপাদন করে। ফলে আমাদের উৎপাদন ব্যয় সনাতনের চেয়ে বেশী হওয়ায় প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা কষ্ঠসাধ্য হয়ে পড়েছে।

ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অটো ব্রিক্স ব্যবহারের কোন বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয় নাই বা বাধ্য বাধকতা নাই। ড. দুলাল বলেন, বিশেষ সংবাদের মাধ্যমে জানতে পাচ্ছি যে,বালু সিমেন্ট ও পাথর দ্বারা বানানো ব্লক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারী প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য ২০% ব্যবহারের বাধ্যকতা করা হচ্ছে। তবে আইন করার পূর্বে জলবায়ুর বিবেচনায় তার বাস্তব দিক এবং উৎপাদনের সময় পণ্যের মান, দাম বিবেচনায় নিতে হবে। যদি আমাদের কোন সুযোগ না দেওয়া হয় তবে যে পরিমান বিনিয়োগ করা হয়েছে তা হুমকির সম্মুক্ষীন হয়ে পড়বে এবং বিনিয়োগকারীগণ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

অটো ব্রিকস ব্যবসায় কি কি জটিলতা রয়েছে বলে মনে করেন? দেখুন বিভিন্ন সময় পরিবেশ অধিদপ্তর ও ডি,সি অফিস থেকে আমাদেরকে আইনী জটিলতায় বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করে থাকে । যার ফলে আমরা আশাহত ও মর্মাহত হচ্ছি এবং এই শিল্পে যাদের নতুন করে বিনিয়োগ করবে বলে পরিকল্পনা করে ছিলো বর্তমানে তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। কারণ গত ১২.১১.২০১৬ ইং পরিবেশ অধিদপ্তর দৈনিক সংবাদ পত্রে এক গণ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন যে, বায়ূর গুণগতমান রক্ষার্থে ইট তৈরির অদক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার না করে পরিবেশ বান্ধব জ্বালানী সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সাশ্রয়ী জ্বালানী ও পরিবেশ বান্ধব বলতে কোন পদ্ধতিকে বলা হইয়াছে তা উল্লেখ নাই। সনাতন পদ্ধতিকে সাশ্রয়ী জ্বালানী বলা যায় না কারন উন্মুক্তভাবে ইট পোড়ানো হয় বিধায় ধোঁয়া সব সময় সব দিক দিয়ে নির্গত হয়। শুধু চিমনী দিয়েই বায়ু দুষিত হচ্ছে তা নয়। এ গুলো নিষিদ্ধ করতে হবে।

ইট পোরানো’র লাইসেন্স এর বাধ্যবাধকতা কি? দেখুন, ইট পোরানো আইন ২০১৮ তে ডি সি অফিস হতে ইট পুরানো লাইসেন্স এর বাধ্যবাধকতা আছে। ফলে অনেক ডি,সি অফিস বিনিয়োগের উপর এল-আর ফান্ডের টাকা দাবী করেন এবং অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। বর্তমানে ইট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ব্যতিত অন্য শিল্প সমূহের কোন লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না। যেহেতু আমাদের প্রতিষ্ঠান বর্তমানে শিল্প হিসেবে বিবেচিত তাই উক্ত ইট পোরানো’র লাইসেন্স হতে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। তাছাড়া একদিকে পরিবেশ বান্ধব ইট প্রস্তুুতকারীদের আমন্ত্রন জানানো হয়েছে আবার অন্যদিকে যারা পরিবেশ রক্ষার নির্মিত্তে পরিবেশ বান্ধব ইট তৈরী করছে তাদেরকে উচ্ছেদের নোটিশ প্রদান করা হচ্ছে যা দ্বৈত নীতির বহিঃপ্রকাশ। ফলে এই ধরনের পরিস্থিতি চলতে থকলে অচিরেই পরিবেশ বান্ধব অটো ব্রিক্স প্রতিষ্ঠান সমূহ ধ্বংস হয়ে যাবে।

অটো ব্রিকস নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা করতে চাইলে বে খাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।যেমন সনাতন পদ্ধতির ইট ভাটা বন্ধ করে চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতি উপ-জেলায় অন্তত ১টি এবং প্রতি জেলায় ৩টি অটোব্রিক্স প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব।অন্যদিকে সনাতন ব্রিক্স উৎপাদনের সাথে জড়িতদেরকে এতে সংযুক্ত করতে হবে। উক্ত পরিকল্পনার সাথে পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অটো ব্রিক্স ম্যানুফেকচারারস এসোসিয়েশন কে একত্রে কাজ করতে হবে। বর্তমানে যে সমস্ত এলাকায় অটো ব্রিক্স যথারিতী উৎপাদনরত আছে ঐ সমস্ত এলাকায় কমপক্ষে ১০টি ইট ভাটাকে লাইসেন্স না দিয়ে অটো ব্রিক্সকে বাজার বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।