‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’

Tureen-Afroz-www.jatirkhantha.com.bdতুরিন আফরোজ: প্রসিকিউটর. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল : ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’..আজ জেগেছে সেই জনতা..! সেই প্রবাদ বাক্যর মত-বিচার বিভাগের দুর্নীতি কি তাহলে দুর্নীতি নয়? বিচারকগণ কি তাহলে আইনের ঊর্ধ্বে? আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’

justice-www.jatirkhantha.com.bdতাহলে আমার প্রশ্ন, আমার দেশের বিচারপতিগণ কি ভিনগ্রহ থেকে আসা কোনো মহামানব যে, আমাদের জনগণ তাদেরকে দুর্নীতি করার অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে?ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থায় ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক বিশাল পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।

রায়ের ২২৬ পৃষ্ঠা থেকে ২২৯ পৃষ্ঠায় তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বিধৃত হয়েছে। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে বেশ কয়েকটি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।যেমন, দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি, রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ, দুর্নীতি পরিস্থিতি, অকার্যকর সংসদ, স্বাস্থ্যখাতের অবনতি, জনপ্রতিষ্ঠানসমূহকে মেধাশূন্যকরণ, প্রশাশনিক অব্যবস্থাপনা, অপরাধের পরিবর্তিত ধরন, নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ব্যর্থতা, নিয়ন্ত্রণবিহীন আমলাতন্ত্র, নির্বাহী বিভাগের ঔদ্ধত্য ও অদক্ষতা ইত্যাদি।

তাহলে মাননীয় প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, তাঁর মতে, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কোনো কিছুই আশাব্যঞ্জক নয়। তবে হ্যাঁ, ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে ২২৯ পৃষ্ঠায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি লিখেছেন:

Even in this endless challenge , the judiciary is the only relatively independent organ of the State which is striving to keep its nose above the water through sinking.

অর্থাৎ তিনি লিখেছেন:- “সীমাহীন প্রতিকূলjustice jainal-www.jatirkhantha.com.bdতার মাঝেও রাষ্ট্রের একমাত্র অপেক্ষাকৃত স্বাধীন অঙ্গ, বিচার বিভাগ, ডুবন্ত অবস্থায়ও নিজের নাক পানির ওপর ভাসিয়ে রাখবার লড়াই করে যাচ্ছে।” এই যে পানির ওপর নাক ভাসিয়ে আমাদের বিচার বিভাগ নিরন্তর লড়াই করে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান সবার ওপরে রাখছেন, দুর্নীতি নিয়ে তার একটা সাম্প্রতিক প্রতিচ্ছবি দেখে আসা যাক।

মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরে, ২০০৯ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে তিনি অবসরে যান। আলোচিত এই বিচারপতি ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ‘বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত’ বলে তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা গেছে।

আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিস দেয় দুদক। জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে আমেরিকায় অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে দুদকের কাছে।

দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যে কারও দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করার এখতিয়ার তাদের রয়েছে।দুদকের কাছে কোনো অভিযোগ এলে প্রথমে অভিযোগ অনুসন্ধান করা হয়। বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিষয়ে অনুসন্ধানের স্বার্থে ২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে চিঠি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন। এর জবাবে ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দুদকে পাঠায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

এই চিঠিতে বলা হয়, বিচারপতি জয়নুল আবেদীন দীর্ঘকাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি অনেক মামলার রায় প্রদান করেছেন। অনেক ফৌজদারি মামলায় তার প্রদত্ত রায়ে অনেক আসামির ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের দেওয়া রায় সকলের উপর বাধ্যকর। এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে দুদক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তার দেওয়া রায়সমূহ প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং জনমনে বিভ্রান্তির উদ্রেক ঘটবে। সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ সমীচীন হবে না মর্মে সুপ্রিম কোর্ট মনে করে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠি পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করেছে দুদক। চিঠিটি কমিশনের সভায় উপস্থাপন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এটির সঠিকতা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চিঠির সঠিকতা যাচাই করে তা আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তীরই বলে নিশ্চিত হয় দুদক। এ বিষয়ে দুদকের একটি নথিতে বলা হয়েছে:

“পত্রটি স্বাক্ষরকারী অরুণাভ চক্রবর্তী মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, প্রধান বিচারপতির অনুমোদন ও নির্দেশক্রমে প্রেরিত পত্রটিতে তার স্বাক্ষর সঠিক।”

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের ২২৮ পৃষ্ঠায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে বর্তমানে ‘অবাধ দুর্নীতি’ চলছে। তাঁর এই দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রতি আমরা অবশই সাধুবাদ জানাই। কিন্তু মাননীয় প্রধান বিচারপতি যখন বিচার বিভাগের দুর্নীতির তদন্ত বন্ধের বিষয়ে চিঠি দিয়ে দ্বৈত অবস্থান গ্রহণ করেন তখন আমরা শঙ্কিত না হয়ে পারি না।

বিচার বিভাগের দুর্নীতি কি তাহলে দুর্নীতি নয়? বিচারকগণ কি তাহলে আইনের ঊর্ধ্বে? আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ তাহলে আমার প্রশ্ন, আমার দেশের বিচারপতিগণ কি ভিনগ্রহ থেকে আসা কোনো মহামানব যে, আমাদের জনগণ তাদেরকে দুর্নীতি করার অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে?

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com